রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময়ে ‘গুম’ হওয়া প্রায় ২৫০ জনের অভিযোগকে স্বতন্ত্র কোনো অপরাধ হিসেবে না দেখে একটি ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত’ (ওয়াইডস্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক) মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে এক মামলার আওতায় বিচারের পরিকল্পনা করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সব প্রক্রিয়া পরিকল্পনামাফিক এগোলে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই এসব ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ শেষ হবে।
এসব গুমের ধরন ও পদ্ধতিতে মিল থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেকের অপহরণের সিস্টেমটা বা প্যাটার্নটা ছিল একই। রাস্তায় আটক করে নিয়ে যাওয়া, কারও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া কিংবা ধরেন চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া, মাইক্রোবাস ব্যবহার করা, কখনও সাদা পোশাকে আসা, কখনো পোশাকে আসা বা একইভাবে নিয়ে পরবর্তীতে তাদের সন্ধান সম্পর্কে তথ্য গোপন রাখা এবং অস্বীকার করা ছিল এসব গুমের কমন প্যাটার্ন।
তিনি জানান, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুম হওয়া ২৫০ জন ভুক্তভোগীর ঘটনা বিশ্লেষণ করে একে স্বতন্ত্র অপরাধ না ধরে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। একই মামলার আওতায় আনা হলেও প্রত্যেক ভুক্তভোগীর জন্য আলাদা অভিযোগপত্র থাকবে।
এর যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আলাদা আলাদাভাবে বিচারের চেয়ে আমরা যদি একটা বিচারের মধ্যে নিয়ে আসি, তাহলে সেটা ট্রাইব্যুনালের যে ওয়াইড স্প্রেড ও সিস্টেমেটিক স্পিরিট সেটা আদালতের কাছে পরিষ্কার করে তুলে ধরার সুযোগ থাকবে এবং সময় বাঁচবে। যে প্রক্রিয়ায় চিন্তা করছি, সেভাবে অনুসন্ধানটা শেষ করতে পারলে এটা নিশ্চয়ই বাংলাদেশে ঐতিহাসিক একটা বিচার হবে।
সেপ্টেম্বরেই তদন্ত প্রতিবেদন?
গুমের ঘটনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পাঁচজন বিশেষজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন এবং প্রধান চিফ প্রসিকিউটর নিজে এর তদারকি করছেন।
ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীদের অপহরণের সময়, স্থান, পদ্ধতি চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের ছবি ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কিছু সিসিটিভি ফুটেজ ও আলামতও জব্দ করা হয়েছে।
তদন্তের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমিনুল ইসলাম বলেন, কল রেকর্ড (সিডিআর), ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্রমাণের ওপর তদন্তে নির্ভর করতে হচ্ছে। তদন্ত দলের সদস্যরা বিভিন্ন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেগুলোর মানচিত্র তৈরির কাজও করছেন।
আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আরও তথ্য ও আলামতসহ ট্রাইব্যুনালে ডাকা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর জানান, সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ২৫০ ভুক্তভোগীর বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের চেষ্টা চলছে।
ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ২০০টির বেশি গুমের অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন। আমিনুল ইসলাম বলেন, তার মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের সঙ্গেও জিয়াউল আহসানসহ কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে।
গুমের পাঁচ শতাধিক অভিযোগ
ট্রাইব্যুনালে গুমের অভিযোগ ইতোমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়েছে। ‘মায়ের ডাক’ থেকে ১১০টি, ‘গুম ফাউন্ডেশন’ থেকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি এবং এর বাইরে আরও অনেক ব্যক্তিগত অভিযোগ এসেছে। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা ৫০০ থেকে ৭০০ হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
তবে সব অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে না জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, যেগুলো স্বতন্ত্র অভিযোগ, এগুলো আমাদের ট্রাইব্যুনালে রাখব না। এগুলো নিচের কোর্টে পাঠায় দিব।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিরোধ বা ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে হওয়া গুমগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে না।
চিফ প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন যে, গুমের ঘটনাগুলো ব্যাপক মাত্রায় ঘটেছে বিশেষ করে ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একই প্যাটার্নে তুলে নিয়ে যাওয়া এই অপরাধগুলোকেই ‘ওয়াইডস্প্রেড ও সিস্টেমেটিক’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইন ২০২৬’ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি এই আইনটিকে যুগোপযোগী মনে করি। সেখানে গুমের সংজ্ঞায় যেটা বলা হয়েছে যে ওয়াইডস্প্রেড বা সিস্টেমেটিক সেটা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। এটি অত্যন্ত যৌক্তিক। কারণ সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ট্রাইব্যুনালে আনলে বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
উল্লেখ্য, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির নেতৃত্বে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো গত ২৬ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে বৈঠক করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
এর আগে ডিজিএফআইয়ের জেআইসি সেল এবং র্যাবের টিএফআই সেলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের দুই মামলা— ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমী এবং ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাশেম আরমানের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ নিয়মিত চলছে বলেও জানান আমিনুল ইসলাম।
র্যাবের টিএফআই সেলের মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনকে আসামি এবং ডিজিএফআইয়ের জেআইসির মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ আসামির বিচার চলছে।
আরএনবি/এফএ