রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
২৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৮ এএম
জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় আরও এক দফা বাড়ানো হয়েছে।
সময় বাড়িয়ে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চার্জশিট দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে ওই দিন তৌফিক-ই-ইলাহীর জামিন আবেদনের পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাড্ডা থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার হন তৌফিক-ই-ইলাহী। পরে ২৭ অক্টোবর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। বয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় তিনি একাধিকবার জামিনের আবেদন করলেও ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেননি।
এদিকে বিনা বিচারে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে গত ২৪ আগস্ট দেওয়া এক বিবৃতিতে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর উদাহরণ দিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
তৌফিক-ই-ইলাহীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান ও আইনজীবী আলী আহমেদ খোকন।
এদিন যেকোনো শর্তে তৌফিক-ই-ইলাহীর জামিন চান তার আইনজীবীরা। এ সময় ট্রাইব্যুনালের কাচের ডক থেকে নিজেকে নিরপরাধ ও অসুস্থ দাবি করে জামিনের আবেদন করেন তৌফিক-ই-ইলাহী নিজেও। তবে প্রসিকিউশন জামিনের বিরোধিতা করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও তিন মাস সময় চায়।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম।
শুনানি শেষে আইনজীবী আলী আহমেদ খোকন বলেন, আইসিটি আইনের ৯(৫) ধারা অনুযায়ী গ্রেপ্তারের এক বছরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তৌফিক-ই-ইলাহীর ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না।
খোকন বলেন, আইসিটি আইনের ৯(৫) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, গ্রেপ্তারের এক বছরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। ড. তৌফিক-ই-ইলী চৌধুরী ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলহাজতে আছেন। প্রায় দুই বছর হতে চলেছে তিনি অন্তরীণ। ট্রাইব্যুনাল এর আগেও দুবার সময় নিয়েছেন, কিন্তু প্রসিকিউশন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। আজ তারা আবারও তিন মাস সময় চেয়েছিল। আমাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন রেখেছেন এবং এর মধ্যে চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালতে তৌফিক-ই-ইলাহীর শারীরিক অবস্থা ও বয়স বিবেচনায় যেকোনো শর্তে জামিন চাওয়া হয়েছে জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, তার বয়স ৮৪ বছর। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ নাগরিক। তিনি কারাগারে অসুস্থ। আমরা বলেছি, তাকে যেকোনো শর্তে জামিন দেওয়া হোক। প্রয়োজনে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা বা গৃহবন্দী রাখার মতো শর্ত দেওয়া হলেও আমাদের আপত্তি নেই।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম বলেন, মামলার বিশালতা ও আসামির আধিক্যের কারণে তদন্তে সময় লাগছে।
তিনি বলেন, আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক জামিন আবেদন ছিল, তাদের তদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। এটি একটি বড় মামলা। ৪৫ জন আসামি। তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন বাদে সবার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন ঘটনাস্থল এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও হতাহতের সংখ্যা অসংখ্য হওয়ায় তদন্তে একটু বেশি সময় লাগছে।
প্রসিকিউটর আরও জানান, যাদের জামিনের আবেদন করা হয়েছে, তাদের চলতি মাসেই তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়েছে।
শুনানি চলাকালে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী নিজেও ট্রাইব্যুনালে বক্তব্য দেন।
কাচের ডক থেকে তিনি বলেন, আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং ৮৪ বছর বয়সী একজন অসুস্থ মানুষ। আইনের নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কেন আমাকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না? বিনা বিচারে আমি কেন এতদিন আটকে থাকব? তদন্ত শেষ করার জন্য নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর জামিন পাওয়া আমার অধিকার।
এর আগে গত ৯ আগস্ট জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৌফিক-ই-ইলী চৌধুরীকে এক দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন আদালত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ আগস্ট ধানমন্ডিতে অবস্থিত তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। জিজ্ঞাসাবাদের সময় আসামির আইনজীবীকে উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়নি বলে জানান তার আরেক আইনজীবী আসাদুজ্জামান আসাদ।
এই আইনজীবী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৯(৫) ধারায় বলা হয়েছে, এক বছরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ছয় মাস তদন্তের জন্য সময় বাড়ানো যাবে। এই সময়ের মধ্যেও প্রসিকিউশন তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে ব্যর্থ হলে আদালত শর্তসাপেক্ষে জামিন মঞ্জুর করতে পারবেন।
তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাড্ডা থানার একটি মামলায় তিনি প্রথম গ্রেপ্তার হন। পরে ২৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এর আগে গত বছরের ৮ মে তার জামিনের আবেদন খারিজ করে দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর আরও দুই দফা জামিন শুনানি পিছিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়িয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
এইচআরডব্লিউর উদ্বেগ
গত ২৪ আগস্ট বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও অন্যদের অনির্দিষ্টকাল বিনা বিচারে আটক রাখা বন্ধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বিবৃতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর উদাহরণও দিয়েছে সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউর বিবৃতিতে বলা হয়, ৮১ বছর বয়সী এই সাবেক উপদেষ্টাকে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ট্রাইব্যুনাল প্রথম আটক করে। এরপর ২২ মাস ধরে তিনি কোনো অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি জামিন চাইলে তা মঞ্জুর হয়নি এবং কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়নি। বরং বিচার কার্যক্রম দুই দফা পিছিয়ে সর্বশেষ আগস্টের শেষ পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তৌফিক-ই-ইলাহী। তিনি সেক্টর ৪-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সাহসিকতার জন্য তাকে বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয়। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা হয়েও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া তৌফিক-ই-ইলাহী স্বাধীনতার পর সচিব ও রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের জামাতা।
আরএনবি/এআর