নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে নিজের জামিন আবেদন প্রত্যাহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তাকে হাজির করা হয়। এদিন তার জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল।
স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনের তাগিদ ফুরিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি আদালতকে বলেন, ‘আমার বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই, সেই সময় ফুরিয়ে গেছে।’
আরও পড়ুন: চিকিৎসা শেষে ফের কারাগারে দীপু মনি
শুনানি শুরুর আগে কথা বলার অনুমতি চাইলে ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুমতি দেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আবেগঘন কণ্ঠে দীপু মনি বলেন, ‘আমি দুই বছর ধরে কারারুদ্ধ আছি। গত এপ্রিল মাসে আমার জামিন আবেদন করা হয়েছে। এখন আমি জামিন চাই না। আমি জামিন আবেদন প্রত্যাহার করতে চাই। এর আগে জামিন আবেদন শুনানির সময় ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, বাসায় গিয়ে কী করবেন? এখন আমার আর বাসায় যাওয়ার দরকার নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামী তৌফিক নেওয়াজ সাত বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। তার বাকশক্তিও ছিল না। কোনো কথা বললে চোখের পলক ফেলে উত্তর দিতেন তিনি। আমি পাঁচ বছর সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় শয্যাশায়ী স্বামীর যত্ন নিয়েছি। এ অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে আমার স্বামীকে দুই বছর অজ্ঞাত স্থানে থাকতে হয়েছে। আশ্রিত অবস্থায় ছিলেন। আমিও যত্ন নিতে পারিনি। এ জীবন তিনি মেনে নিতে পারেননি।’
গত ১৮ আগস্ট রাতে দীপু মনির স্বামী তৌফিক নেওয়াজ মারা যান। সেই শোকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চার মাস আগে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তার কাছে যাওয়ার জন্য জামিন আবেদন করেছিলাম। ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গীর শেষ সময়ে কাছে থাকতে পারিনি। এখন আমার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমি আর কার কাছে যাব? সন্তানরা জামিন চায়। কিন্তু আমার বাসায় যাওয়ার আর তাড়া নেই।’
শুনানি শেষে তার আইনজীবী সিফাত মাহমুদ মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘সাবেক মন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি এই ট্রাইব্যুনালে যেই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়। ট্রাইব্যুনালের আইনে বিধান আছে এক বছরের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন না হলে আসামিকে জামিন দিতে পারেন। আমরা গত ২৬শে এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তার পক্ষে জামিন আবেদন করেছিলাম। আমাদের আবেদনের মূল কারণ ছিল তার স্বামী ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ দীর্ঘ সাত বছর বাকশক্তিহীন অবস্থায় অসুস্থ ছিলেন। তার পাশে থাকার জন্যই জামিন চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ১৮ই আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেছেন। সুতরাং যে কারণে জামিন চাওয়া হয়েছিল, সেই কারণটি এখন আর এক্সিস্ট করছে না। সে কারণে উনি আবেগাপ্লুত হয়ে আবেদনটি প্রত্যাহার করতে চেয়েছেন।’
হেফাজতের মামলার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, ‘হেফাজতের মামলা এবং এই মিসলেনিয়াস কেস ৩/২৪ (মামলার আবেদন) - দুটি ভিন্ন মামলা। এটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ঘটনাবলি সম্পর্কিত আর হেফাজতের মামলা ২০১৩ সালের ৫ই মে’র। প্রত্যেকটা মামলায় আলাদা আলাদাভাবে জামিন নিতে হয়। এই মামলায় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ওনাকে আটকে রাখা হয়েছে বলেই আমরা জামিন আবেদন করেছিলাম।’
অন্যদিকে প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে বলেন, ‘প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমরা দেখিয়েছি যে ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় বিচার চলমান আছে। ১৩ জন আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো অব্যাহত আছে। এই মামলায় আমরা আরও তিন মাসের জন্য সময় বর্ধিত আবেদন করেছিলাম যেন সকল তদন্ত একসাথে শেষ করে ফেলতে পারি। ট্রাইব্যুনাল আমাদের আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।’
তদন্তে বিলম্বের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এটি একটি বড় মামলা, ৪৫ জন আসামি। অল্প কয়েকজন বাদে আর সবার ফরমাল চার্জ দেওয়া হয়েছে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের সংখ্যা এবং হতাহতের সংখ্যা অসংখ্য এবং ঘটনাস্থল সারা বাংলাদেশব্যাপী হওয়ায় তদন্তে একটু বেশি সময় লাগছে। এছাড়া এই মামলায় যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে দাখিল করা হয়েছে সেই ২৩ জনের নাম স্ট্রাইক আউট (বাতিল করে দেওয়া) করার আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেছেন। তাদের আর এই মামলায় হাজিরা দিতে হবে না।’
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল দীপু মনির বক্তব্যে সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, ‘তারা দীপু মনির বিষয়ে ব্যথিত এবং তার আবেদনের যৌক্তিকতা আছে, তবে অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়।’
আদালত আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর জামিন শুনানির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
আরএনবি/এমআই