Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

নুসরাত হত্যা: আপিলে খালাস পেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যে ১০ আসামি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

ফেনীর আলোচিত মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে ১০ জনকেই খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে বহুল আলোচিত এ মামলায় প্রধান আসামি মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।

রায়ে নুসরাতের মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা ও তার সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ও জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন।

খালাসপ্রাপ্তরা হলেন-সোনাগাজীর সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদরাসার গভর্নিং বডির তৎকালীন সহ-সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) শুনানি শেষে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার পরীক্ষা কেন্দ্র সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পাঁচ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি। এর আগে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন নুসরাত।

ওই ঘটনায় নুসরাতের মা মামলা করার পর ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সিরাজ গ্রেফতার হওয়ার পর তার মুক্তি দাবিতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ও মাদরাসার কিছু শিক্ষার্থী মানববন্ধনে নামে। মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হয় নুসরাতের পরিবারকে।

মৃত্যুর আগে ৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকদের কাছে জবানবন্দিতেও অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যান এই তরুণী।

নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুদিন পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর তা হত্যা মামলায় রূপ নেয়।

প্রথমে সোনাগাজী থানার পরিদর্শক কামাল হোসেন মামলাটি তদন্ত করলেও পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ওঠায় পরে তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই বছরের ২৯ মে পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন।

হত্যাকাণ্ডের সাত মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

এছাড়া নুসরাতের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তৎকালীন সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে আট বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন ট্রাইব্যুনাল। এটি বাংলাদেশের প্রথম সাইবার ট্রাইব্যুনালে প্রকাশিত রায়।

এরপর আসামিপক্ষ সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও সংশ্লিষ্ট বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য ২০২৬ সালের ১০ জুন হাইকোর্টের এ বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। ১৪ জুন বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়। সাত বছর আগের এ হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ২৮ জুলাই। টানা ১৭ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত বৃহস্পতিবার রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়।

আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও মুহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফুল আলম ও মাহবুবা তাসনিম আখি।

আদালতের আদেশের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির বলেন, ১৬ আসামির আইনজীবীরা বক্তব্য উপস্থাপনের পর গত বুধবার প্রথমার্ধে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এরপর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে রাষ্ট্রপক্ষ চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া শুরু করে, যা বৃহস্পতিবার শেষ হয়।

তিনি বলেন, এখন ন্যায়বিচারের দায়ভার আদালতের ওপর। আসামিপক্ষ এ দেশের নাগরিক, ভিকটিমও এ দেশের নাগরিক। আমরা চাই না কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির সাজা হোক।

এমআর