Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে হেঁটেছে আওয়ামী লীগ: সাংবাদিক আশরাফ

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্নে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা হোঁচট খায়, যার পরিণতি ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দেওয়া সাক্ষ্যে এভাবেই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল্যায়ন করেছেন লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আশরাফ কায়সার।

রোববার (২৬ জুলাই) ট্রাইব্যুনালে দেওয়া নিজের দীর্ঘ জবানবন্দিতে তিনি ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার প্রবণতা এবং আন্দোলন দমনে গণহত্যার সার্বিক বিবরণ তুলে ধরেন।

সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আশরাফ কায়সার নিজের লেখা ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক একটি বই আদালতে উপস্থাপন করেন, যা পরে ‘প্রদর্শনী-১১৯’ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

এদিন বেলা ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

এ সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর এম এইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিমসহ অন্যরা। 

সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন এবং শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান এর পক্ষে স্টেট ডিফেন্স ইসরাত জাহান অনি জেরা শুরু করেন। 

‘মুজিববাদ’ থেকে ‘হাসিনাবাদ’

১৯৭১ পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে আশরাফ কায়সার জবানবন্দিতে বলেন, স্বাধীনতার পরপরই ভিন্নমতের প্রতি অশ্রদ্ধা ও মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে সরকারবিরোধিতা হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়।

সেই সময়কার বিভিন্ন বাহিনীর ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা তখন জয় বাংলা বাহিনী, লাল বাহিনী, রক্ষী বাহিনী, শ্রমিক লীগের মতো অনেক বাহিনীর বেপরোয়া আচরণ পর্যবেক্ষণ করি। সরকারের পাশাপাশি এই বাহিনীগুলো কখনও মুজিববাদ প্রতিষ্ঠা, কখনও বিরোধী রাজনীতি দমন, কখনও বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে মানুষের অধিকারকে পদদলিত করেছে।

১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ড এবং মেজর এম এ জলিলকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রবণতা আমরা ১৯৭২ সাল থেকেই দেখতে শুরু করি। দলটির রাজনৈতিক চরিত্রই হচ্ছে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা।

তার ভাষ্যমতে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার শাসনামলেও একই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ফিরে আসে। ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে ‘রাষ্ট্রের স্থিতি নষ্ট করার প্রচেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেন, এর পটভূমি তৈরিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের ভূমিকা ছিল।

পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি’ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঠিক ৭২-৭৫ এর সময়ের মতো আওয়ামী লীগ সরকার ধীরে ধীরে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকে পুনরায় যেতে থাকে। তখন যেমন ‘মুজিববাদ’ প্রচার করা হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে তারা ‘হাসিনাবাদ’ প্রচার করতে থাকে।

ছাত্রলীগকে ‘অক্সিলিয়ারি ফোর্স’ হিসেবে ব্যবহার

জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন আশরাফ কায়সার। তিনি আদালতকে জানান, সেই সময় সবাইকে আওয়ামী লীগের ‘ক্যাডার বা দাস’ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।

আন্দোলন দমনে সরাসরি নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, ছাত্রদের আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এই বক্তব্যের পরদিনই আমরা দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ও শহরগুলোতে ছাত্র-তরুণদের ওপর, বিশেষ করে নারীদের ওপর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী আক্রমণ দেখতে পাই।

১৪ দলীয় জোট নেতাদের ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই গণমাধ্যমকর্মী বলেন, সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ এমনকি সৈনিক লীগ ও শিশু লীগকে আমরা ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দেখি। জাতিসংঘের রিপোর্টেও পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের মিলিশিয়াদের আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিবৃত হয়েছে।

জুলাই আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষের প্রাণহানি এবং ২৫ হাজার মানুষের আহত ও অঙ্গহানির ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর রাজনীতি নিষিদ্ধের ইঙ্গিত দেন এই সাক্ষী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোকে রাজনীতির পরিমণ্ডলে রাখার ব্যাপারে একটি নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে, যাতে দেশ আর কখনোই এ ধরনের শাসন ব্যবস্থা ও সহিংস রাজনীতিতে ফিরে যেতে না পারে।

হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের আইজিপি, র‍্যাব প্রধানসহ আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ এ আরাফাত এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের নাম উল্লেখ করেন।

এই মামলার সাত আসামিই পলাতক রয়েছেন। ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্যরা হলেন— আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

এর আগে, ৩০ জুন এই মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কথা ছিল। তবে নতুন করে সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়। 

গত ২৭ এপ্রিল মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। ওই দিন ২৬তম সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা আহমেদ নাসের উদ্দিন মোহাম্মদকে জেরা করেন আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান। তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল ১৯ এপ্রিল।

আরএনবি/এফএ