Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানে শূন্যতা ও সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৭ জুলাই ২০২৬, ০২:০৭ পিএম

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘শূন্যতা ও সমান্তরাল ব্যবস্থা’ তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন রিটকারী পক্ষের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানিতে যুক্তি উপস্থাপনের সময় তিনি এ কথা বলেন।

দীর্ঘ ছয় মাসের বেশি সময় পর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে গতকাল সোমবার পুনরায় মামলাটির শুনানি শুরু হয়। প্রথম দিনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ পরবর্তী শুনানির জন্য আজকের দিন ঠিক করে দেয়।

মঙ্গলবার শুনানিতে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া পঞ্চদশ সংশোধনীর বিভিন্ন আইনি দিক তুলে ধরে পুরো সংশোধনী বাতিলের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর রহমান হক। অন্যদিকে আপিলকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া ও মোহাম্মদ শিশির মনির।

শুনানিতে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘শূন্যতা ও সমান্তরাল ব্যবস্থা’ তৈরি করা হয়েছিল।

বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষের এই আইনজীবী বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানে একটা শূন্যতা (ভ্যাকুয়াম) তৈরি করেছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ব্যাপক ও আমূল পরিবর্তন এনে একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা (প্যারালাল রেজিম) তৈরির মতো অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছিল।’

সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে স্পষ্টতই কিছু অবৈধ ও বেআইনি বিধান আনা হয়েছিল। যেমন- সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচার বা মৌলিক বিষয়গুলো আর কখনো সংশোধন করা যাবে না—এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।’

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নিয়ে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতির অভিশংসনের বিষয়টি পরিবর্তন করা হয়, যার ধারাবাহিকতায় পরে ষোড়শ সংশোধনী আসে। পরবর্তীতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের কারণে বিচারকদের অভিশংসনের সুযোগ না থাকায় একপর্যায়ে শূন্যতা তৈরি হয়। যার ফলশ্রুতিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আবার পুনর্বহাল হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে জনসাধারণের বিচারের নিশ্চয়তা পাওয়ার বিষয়টি জড়িত। আমরা আদালতে বলেছি, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ সংক্রান্ত ১১৬ অনুচ্ছেদে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল করার বিষয়ে আদালত যেন চূড়ান্ত আদেশ দেন।’

এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের ওই রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত ২০ ও ২১ ধারা, অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা ৭ (ক) অনুচ্ছেদ, মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার ৭ (খ) অনুচ্ছেদ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে বাতিল করা হয়। পাশাপাশি গণভোট বাতিল সংক্রান্ত ৪৭ ধারা বাতিল করে সংবিধানে ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়।

তবে রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত জানিয়েছিল, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিমার্জন করতে পারবে।

ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হলেও, পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রিট মামলার বাদীপক্ষ।

এই মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও আলাদাভাবে আপিল করেন। বর্তমানে সব মিলিয়ে তিনটি আপিলের শুনানি একসঙ্গে চলছে।

গত বছরের ১৯ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট। পরবর্তীতে ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণফোরামসহ কয়েকজন আবেদনকারী রুলে ইন্টারভেনার হিসেবে পক্ষভুক্ত হন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ডিসেম্বরে হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করে, যা এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

আরএনবি/এমআর