ঢাকা মেইল ডেস্ক
২৭ জুন ২০২৬, ০৫:১২ পিএম
অমিতাভ রেজা নির্মিত ‘আয়নাবাজি’ সিনেমায় জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীকে অন্যের হয়ে ভাড়ায় জেল খাটতে দেখা গিয়েছিল। সেই একই উদ্দেশে আদালতে এসে সম্প্রতি আটক হন মনোয়ারা নামে এক নারী। তিনি এখন কোথায় আছেন?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আদালতে আয়নাবাজি করতে আসা পঞ্চাশোর্ধ মনোয়ারা বর্তমানে দুই দিনের রিমান্ডে আছেন।
শুক্রবার (২৬ জুন) আটক ওই নারীকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি চেক ডিজঅনার মামলায় মূল আসামি আরেক নারী নাসরিন সিকদারের পক্ষে প্রক্সি হাজিরা দিতে এসে আটক হন মনোয়ারা।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২৯ লাখ টাকা চেক ডিজঅনারের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ নিবেদিতা আহমেদ তুলি নামে এক সরকারি চাকরিজীবী আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলার ধার্য দিন ছিল ১৬ জুন। সেদিন আসামি আদালতে হাজির হননি। ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ তানিয়া সুলতানা লিপির আদালত আসামির জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পরবর্তী শুনানির দিন রাখা হয় ২০ আগস্ট।
যেভাবে ধরা পড়েন ভুয়া আসামি মনোয়ারা
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) মামলার প্রকৃত আসামি নাসরিন সিকদার সাজিয়ে মনোয়ারাকে আদালতে হাজির করে জামিন আবেদন করেন আইনজীবী হাম্মাদ এমদাদ হোসাইন।
এদিন মামলার শুনানিকালে ভুয়া আসামি মনোয়ারাকে এজলাসের সামনে ডেকে নেন বিচারক তানিয়া সুলতানা লিপি। এসময় তার মুখে মাক্স পরা ছিল। বিচারক মাক্স খুলতে বলেন। কয়েক দফা বলার পরও মাক্স খুলতে রাজি হননি মনোয়ারা। পরে পুলিশের একজন নারী সদস্য তার মুখ থেকে মাক্স খুলে নেন।
সেদিন সংশ্লিষ্ট আদালতের অফিস সহায়ক শাহ আলম জানান, যার বিরুদ্ধে মামলা তার বাসা গুলশানে। আর মামলা ২৯ লাখ টাকার। মনোয়ারার বেশভূষা দেখে সন্দেহ হয় বিচারকের। স্বামীর নাম, বাবার নাম জানতে চান। তিনি স্বামীর নামের জায়গায় বাবার নাম আর বাবার নামের জায়গায় বলেন স্বামীর নাম।
এরপর বিচারক মনোয়ারার কাছে জানতে চান, মামলা কত টাকার। জবাবে তিনি বলেন, ৩০ লাখ টাকার।’ বিচারক জানতে চান, এত টাকা দিয়ে কী করেছেন?’ মনোয়ারা বলেন, ‘আর কইয়েন না, স্যার।’ আপনি তাহলে কেন আসছেন। মনোয়ারা বলেন, ‘মামলা খালাস করতে আসছি।’
পরে বিচারক তার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলে মনোয়ারা আইনজীবীর চেম্বারে রেখে এসেছেন বলে জানান। তিনি সেখান থেকে পরিচয়পত্র নিয়ে আসার কথা বলেন। তবে বিচারক তাকে যেতে দেননি। মনোয়ারাকে স্বাক্ষর করতে বললেও তিনি দিতে পারেননি, টিপসই দেন। এরই মাঝে এজলাস ছেড়ে বেরিয়ে যান আইনজীবী হাম্মাদ এমদাদ হোসাইন।
পরে বিচারক মনোয়ারাকে আসামির কাঠগড়ায় আটকে রাখার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। মনোয়ারা নিজের ছবি দিয়ে নাসরিন সিকদার নামে জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি করেছেন বলে জানান অফিস সহায়ক শাহ আলম।
এরপর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মনোয়ারার কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, কেন তিনি আদালতে এসেছেন। কোনো জবাব না দিয়ে এসময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরে মনোয়ারা জানান, তার বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে। সূত্রাপুরের কলতাবাজারে পরিবারের সঙ্গে থাকেন। বাসা-বাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি আইনজীবীদের চেম্বার পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তিনি।
মনোয়ারার ভাষ্য, টাকা দেওয়ার কথা বলে আইনজীবী তাকে নিয়ে আসেন। এবারই প্রথম এসেছেন বলে দাবি করেন করেন তিনি। কত টাকা দেবে- এমন প্রশ্নে মনোয়ারা বলেন, ‘টাকার কথা কয় নাই।’ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে চাইলে ওই নারী বলেন, ‘আর কথা কইয়েন না। মাথা ঘোরে।’
এরপর আবার অঝোরে কাঁদতে থাকেন মনোয়ারা। তিনি বলেন, ‘আমি কাম করে খাই। আমার ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে বাসায়। আল্লাহর ওয়াস্তে আমারে ছাইড়া দেন। আল্লাহ আপনাদের ভালো করবে।’
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, প্রকৃত আসামি নাসরিনের সঙ্গে বাদী নিবেদিতা আহমেদ তুলির পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় বিভিন্ন সময় ফ্ল্যাট কেনার জন্য ২৯ লাখ টাকা দেন। এর পরিবর্তে গত বছরের জানুয়ারির ২৭ তারিখ ব্র্যাক ব্যাংকের একটা দেন।
পরবতীকে বাদী তার নামে সোনালী ব্যাংকে চেকটা নগদায়নের জন্য জমা দিলে অপর্যাপ্ত তহবিলে ডিজঅনার হয়। এরপর গত বছরের ২৩ মার্চ মামলা করেন ভুক্তভোগী নিবেদিতা। সেই মামলায় ‘আয়নাবাজি’ করতে এসে এখন রিমান্ডে ভুয়া আসামি মনোয়ারা।
এএইচ