images

আইন-আদালত

আদালতে কাঁদতে কাঁদতে শিউরে ওঠা বর্ণনা দিলেন রামিসার মা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

০২ জুন ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম

‘আমি বারবার স্বপ্নাকে কাঁদতে কাঁদতে বলি— বইন, দরজাটা খোল। আমি তোকে কিছু বলব না। কিন্তু সে দরজা খোলে নাই। পরে দরজা ভাঙতে হয়। ভেতরে গিয়ে মেয়ের খণ্ডিত মরদেহ দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই’— আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ৮ বছরের মেয়ে রামিসাকে হারানোর সেই বিভীষিকাময় দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা পারভীন আক্তার।

মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

এ সময় কাঠগড়ায় হাজির করা ছিলেন মূল আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না বেগম। মায়ের বর্ণনায় উঠে আসে কীভাবে একটি ফুটফুটে শিশুকে নির্মমভাবে খুন করে তার দেহ ও মাথা আলাদা করে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

ঘটনার দিন গত ১৯ মে সকালের স্মৃতিচারণ করে পারভীন আক্তার বলেন, ‘আমি তখন রান্না করছিলাম। আমার বড় মেয়ে রাইসাকে সকাল ১০টার দিকে তার চাচার বাসায় যেতে বলি। তখন ছোট মেয়ে রামিসাও আপুর সাথে যাওয়ার বায়না ধরে। আমি বারণ করিনি। কিন্তু পরে বড় মেয়ে তাকে না নিয়েই চাচার বাসায় চলে যায়, যা আমি রান্নাঘর থেকে বুঝতে পারিনি।’

এর কিছুক্ষণ পরই রান্নাঘর থেকে একটি শিশুর চিৎকারের শব্দ শুনতে পান পারভীন আক্তার। পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেলদের বাসায় কোনো বাচ্চা নেই জানতেন তিনি। বাইরে এসে কাউকে না পেয়ে নিচে খোঁজ করতে যান। এরই মধ্যে বড় মেয়ে একা ফিরে এলে জানতে পারেন রামিসা তার সাথে যায়নি।

সোহেলের বাসার দরজার সামনে পড়ে ছিল রামিসার জুতো

পুরো বিল্ডিং ও আশপাশে খুঁজেও যখন রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন তিনতলায় সোহেলদের বন্ধ রুমের সামনে মেয়ের একটি জুতো পড়ে থাকতে দেখেন পারভীন। তখনই তার মনে পড়ে একটু আগে শোনা সেই চিৎকারের কথা।

পারভীন আক্তার বলেন, আমি দরজা ধরে বারবার ধাক্কাতে থাকি, কিন্তু কেউ খোলে না। পরে ওপর তলার বাসিন্দা ও নিচে থেকে আরও ১০-১২ জন মানুষকে ডেকে আনা হয়। খবর দেওয়া হয় আমার স্বামীকেও, তিনি ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে অফিস থেকে ছুটে আসেন।

সবাই মিলে একপর্যায়ে দরজার গোল্ডেন বোল্ট লকটি ভেঙে ফেলেন। আর সেই ভাঙা লকের ছিদ্র দিয়ে ভেতরে তাকাতেই সবার চোখ চড়কগাছ হয়ে যায়। পারভীন আক্তার বলেন, ছিদ্র দিয়ে দেখি বাথরুম খোলা এবং ভেতরে রক্ত ভেসে যাচ্ছে! রাজু নামে একটা ছেলে সেটার ভিডিও করছিল। আমি চিৎকার করে কাঁদছিলাম আর ভেতরে আসামি স্বপ্নাকে হাঁটতে দেখে বলছিলাম— বইন দরজাটা খোল। কিন্তু সে খোলেনি।

বাথরুমে বালতিতে মাথা, খাটের নিচে দেহ!

অবশেষে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর যে বীভৎস দৃশ্য তারা দেখেন, তা যেকোনো মানুষের বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আদালতে মা বলেন, ভেতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের মাথা এক জায়গায় আর দেহ আরেক জায়গায়। মাথাটা বাথরুমের বালতিতে রাখা, আর দেহটা আসামিদের রুমের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু আদালতে জানতে চান, কাঠগড়ায় থাকা আসামিদের মধ্যে স্বপ্না আছেন কি না। তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে কাঠগড়ার দিকে হাত উঁচিয়ে পারভীন আক্তার বলেন, ‘হ্যাঁ, ওই যে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। আমি কত বলছি, বইন দরজাটা খোল, দরজাটা খোল। কিন্তু খোলে নাই সে।’

বেলা ১১টা ৩ মিনিটে শুরু হওয়া রামিসার মায়ের এই সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরা শেষ হয় ১১টা ২৬ মিনিটে। এর আগে রামিসার বাবাও আদালতে তার সাক্ষ্য প্রদান করেন।

মামলার চার্জশিট সূত্রে জানা যায়, প্রধান আসামি সোহেল রানা মাদকাসক্ত ছিল। ঘটনার দিন শিশু রামিসাকে বাথরুমে টেনে নিয়ে সে ধর্ষণ করে। রামিসা চিৎকার করায় এবং পরিবারকে বলে দেওয়ার কথা বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথা ও হাত কেটে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে সোহেল। আর এই জঘন্য অপরাধের পর লাশ গুম করা ও পালিয়ে যেতে সরাসরি সহযোগিতা করেছিল তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার।

বিইউ/এআর