নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫৩ পিএম
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর আদালত কক্ষেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন। রায় শোনার পর থেকে প্রিজন ভ্যানে ওঠা পর্যন্ত নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি, আমি হুকুমের গোলাম। আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো?’
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর আদালত কক্ষ থেকে বের করে আনার সময় উত্তেজিত হয়ে ওঠেন আমির হোসেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি পুলিশের চাকরি করি, নির্দেশ পালন করাই আমার দায়িত্ব। ওপরের নির্দেশে কাজ করেছি, আমি একা কেন দায়ী হবো? আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। আমি এই রায় মানি না।’ এ সময় তাকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতেও দেখা যায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বারবার বলেন, ‘যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেভাবেই কাজ করেছি। এখন কেন আমাকে ফাঁসানো হলো?’
এ মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি বাকি ২৮ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন— আরপিএমপির সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই-সশস্ত্র) মো. আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
এ ছাড়া কোতোয়ালী জোনের সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই-নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধবকে এক ধারায় যাবজ্জীবন এবং অন্য ধারায় ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
১০ বছর করে কারাদণ্ড পেয়েছেন সাতজন। তারা হলেন— বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, আরপিএমপির সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
অন্যদিকে সাতজনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন— আরপিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, ছাত্রলীগের রংপুর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু এবং রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন।
তিন বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন— সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী (গ্লোরিয়াস), সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দফতর সম্পাদক বাবুল হোসেন এবং এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল।
এছাড়া এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু এবং নিরাপত্তাকর্মী নূর আলম মিয়াকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, আবু সাঈদ দুই হাত মেলে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, আর পুলিশ তার বুকে গুলি চালাচ্ছে। এ ঘটনাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় গত বছরের ২৪ জুন ৩০ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরে ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন এবং ২৭ আগস্ট সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। পরদিন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় এবং ২৭ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজ রায় ঘোষণা করা হয়।
/এএস