নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৭ পিএম
রাজধানীর হাইকোর্ট এলাকার কাছে দুটি প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের ২৬ টুকরো লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলায় নিহতের বন্ধু তথা হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা জরেজ ও তার বান্ধবী শামীমার পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
শনিবার (১৫ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জেনিফার জেরিন এই আদেশ দিয়েছেন।
এদিন মামলার দুই আসামি জরেজ ও তার বান্ধবী শামীমাকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা শাহবাগ থানার হত্যা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। আদালত শুনানি শেষে পাঁচ দিন মঞ্জুর করেন।
এর আগে শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে জরেজকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অন্যদিকে তার বান্ধবী শামীমাকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে র্যাব-৩।
গত ১১ নভেম্বর মালয়েশিয়া ফেরত বাল্যবন্ধু জরেজকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় আসেন পেশায় কাঁচামালের আমদানিকারক আশরাফুল হক। এরপর জরেজসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজন ১৩ নভেম্বর পরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করে।
এদিন সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার হাইকোর্ট-সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের পাশে একটি ড্রাম থেকে আশরাফুলের ২৬ টুকরো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে পরিচয় শনাক্ত না হলেও পরে আঙুলের ছাপ নিয়ে নিহতের নাম-ঠিকানা জানা যায়।
র্যাবের কাছে দেওয়া প্রাথমিক জবানবন্দিতে গ্রেফতার শামীমা জানান, হানি ট্র্যাপে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে ১০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আশরাফুলকে ঢাকায় ডেকে আনা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনার মূল নায়ক ছিলেন নিহতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জরেজ।
শামীমা আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর মালয়েশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল জরেজের। এজন্য পাসপোর্টও তৈরি করতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই তারা গ্রেফতার হন।
র্যাব জানায়, এক বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক থাকা জরেজের প্ররোচনায় শামীমা এক মাস আগে থেকে আশরাফুলের সঙ্গে নিয়মিত অডিও-ভিডিও কলে যোগাযোগ শুরু করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি আশরাফুলকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ঢাকায় আসতে রাজি করান। গত ১১ নভেম্বর জরেজ ও আশরাফুল রংপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। এর পরদিন দুজনে শামীমার সঙ্গে দেখা করে শনির আখড়ার নূরপুর এলাকায় ভাড়া করা বাসায় ওঠেন।

রংপুর থেকে রওনা হওয়ার আগেই জরেজ শামীমাকে জানায় যে, আশরাফুলকে অন্তরঙ্গভাবে নিয়ে তার ভিডিও ধারণ করতে হবে এবং পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে তারা তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা আদায় করবে। সেই মোতাবেক ঢাকার বাসায় নিয়ে শামীমা শরবতের সঙ্গে ঘুমের ট্যাবলেট মেশান। এরপর শামীমা ও আশরাফুলের অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করে জরেজ।
আশরাফুল অচেতন হলে তার হাত রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং মুখ কসটেপ দিয়ে আটকে দেয় জরেজ। অতিরিক্ত ইয়াবা সেবন করে উত্তেজিত হয়ে অচেতন আশরাফুলকে হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন জরেজ।
জবানবন্দিতে শামীমা দাবি করেন, তিনি জরেজকে হত্যার সময় বাধা দিয়েছিলেন, কিন্তু এতে জরেজ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকেও মারধর করেন। অতিরিক্ত আঘাত এবং মুখ কসটেপ দিয়ে আটকানো থাকায় শ্বাস না নিতে পেরে একপর্যায়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান আশরাফুল।
এরপর লাশ একই ঘরে রেখে জরেজ ও শামীমা রাত্রীযাপন করে দুজনে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। পরদিন আশরাফুলের মৃতদেহ গুম করার জন্য স্থানীয় বাজার থেকে চাপাতি ও ড্রাম কিনে আনেন। এরপর সেই চাপাতি দিয়ে আশরাফুলের মরদেহটি ২৬ টুকরো করে ড্রামে ভরেন। পরে একটি অটোরিকশা ডেকে নিয়ে তাতে তোলেন। পথে আরও একটি অটোরিকশা পাল্টান। শেষে লাশ ভর্তি ড্রাম দুটি হাইকোর্টের পানির পাম্প সংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশে একটি বড় গাছের নিচে ফেলে দেন। এরপর তারা দ্রুত সেখান থেকে সটকে পড়েন।
র্যাব জানায়, শামীমার দেওয়া তথ্যমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দড়ি, কসটেপ, চাপাতি ও রক্তমাখা পোশাক শনির আখড়ার নূরপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক ফায়েজুল আরেফীন বলেন, শামীমার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ব্লাকমেইল করে টাকা উপার্জন করায় তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। তবে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্বশত্রুতা আছে কি না মূল আসামি জরেজকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছে র্যাব।
নৃশংস এ ঘটনায় শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) নিহত আশরাফুল হকের বোন আনজিরা বেগম বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় জরেজসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েজনকে আসামি করা হয়।
এএইচ