Dhaka Mail Logo

সাক্ষাৎকার

‘গ্রামীণ বর্জ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা’

আব্দুল হাকিম

০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম

গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়ে থাকা বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। জুতার কারখানার উচ্ছিষ্ট থেকে জুতার সোল তৈরি, মাছের আঁশ থেকে জিলাটিন উৎপাদন কিংবা কৃষিপণ্যের অব্যবহৃত অংশ কাজে লাগিয়ে নতুন পণ্য তৈরির মতো উদ্যোগ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও বাজারসংযোগের মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।

পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের মনে করেন, প্রকৃতিতে বর্জ্য বলে কিছু নেই। সঠিক প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিটি উপাদানকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা সম্ভব। ক্ষুদ্র উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শুধু একজন উদ্যোক্তার কর্মসংস্থান হয় না, এর সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনসহ বিস্তৃত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

পিকেএসএফ আগামী পাঁচ বছরে অতিরিক্ত ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব কর্মসংস্থানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে ওস্তাদ-সাগরেদ মডেল, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অঙ্কের অর্থায়ন এবং কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজনের মতো উদ্যোগও এ পরিকল্পনার অংশ।

টেকসই কর্মসংস্থান, গ্রামীণ শিল্পের নতুন সম্ভাবনা, চক্রাকার অর্থনীতি, কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিয়ে সম্প্রতি ঢাকা মেইল-এর সঙ্গে কথা বলেছেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল হাকিম।

ঢাকা মেইল: পিকেএসএফ কী ধরনের প্রতিষ্ঠান? সাধারণ মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠানটি কী কী কাজ করে?

মো. ফজলুল কাদের: পিকেএসএফ হচ্ছে একটি দ্বিতীয় স্তরের প্রতিষ্ঠান বা সেকেন্ড টায়ার অর্গানাইজেশন। বিষয়টি বোঝার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদাহরণ দেওয়া যায়। আমরা সাধারণ মানুষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যাই না। আমরা যাই বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে। পিকেএসএফও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো দ্বিতীয় স্তরের একটি প্রতিষ্ঠান। এ কারণে একে এপেক্স অর্গানাইজেশন বা শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানও বলা হয়। আমরা সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে অর্থায়ন করি না। অর্থায়ন করি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন বা এমএফআই। আর সাধারণ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা পান।

1

অর্থায়নের পাশাপাশি পিকেএসএফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। বাংলাদেশে বর্তমানে এমএফআইগুলোর সিংহভাগই পিকেএসএফের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ পিকেএসএফকে প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রতিষ্ঠানও বলতে পারেন। এসব প্রতিষ্ঠান দরিদ্রবান্ধব অর্থায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থায়ন কার্যক্রম যাতে কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, সে জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের অনার্থিক সেবাও যুক্ত করি। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ যেন অর্থায়নের সুবিধা সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে পারেন এবং পিছিয়ে পড়া মানুষ সামনে এগিয়ে যেতে পারেন।

ঢাকা মেইল: কর্মসংস্থান বাড়াতে পিকেএসএফ কী ধরনের অর্থায়ন, কৌশল ও উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে?

মো. ফজলুল কাদের: পিকেএসএফের সামগ্রিক কার্যক্রম আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুসারে তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথম স্তম্ভ হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এটিই আমাদের কার্যক্রমের মূল ভিত্তি। দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে দক্ষতা উন্নয়ন, যাতে কর্মসংস্থান লাভজনক ও অর্থবহ হয়। শুধু কর্মসংস্থান তৈরি করলেই হবে না, সেটি যাতে মানুষের জন্য কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে ঝুঁকি প্রশমন। আমরা যেসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করি, সেগুলোর সঙ্গে নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি, ব্যবসায় ব্যর্থতার ঝুঁকি, ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা, ঋণসংক্রান্ত ঝুঁকি এবং উৎপাদিত পণ্যের বিপণনসংক্রান্ত ঝুঁকি রয়েছে। আমরা এসব ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে কাজ করি।

অর্থাৎ একদিকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পথে যেসব ঝুঁকি আসে, সেগুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা আমাদের লক্ষ্য। যেসব ঝুঁকি বিমাযোগ্য, সেগুলোকে ধীরে ধীরে বিমার আওতায় আনতে চাই। অন্য ঝুঁকিগুলোকে টেকসই ঝুঁকি প্রশমন কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।

আমাদের ১৩টি চলমান কর্মসূচি রয়েছে। আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও শুধু প্রকল্পনির্ভর কার্যক্রম পছন্দ করি না। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করি চলমান কর্মসূচিগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য। কোনো প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও মানুষ যাতে এর সুফল পেতে পারেন, সেভাবেই প্রকল্পগুলোকে কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করি।

ঢাকা মেইল: কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আয় সেভাবে বাড়ছে না। কৃষকের মুনাফা বাড়াতে কী ধরনের চিন্তা ও উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন?

মো. ফজলুল কাদের: আমাদের একটি দর্শন হচ্ছে, প্রাথমিক কৃষিপণ্যে যতটা সম্ভব মূল্য সংযোজন করা এবং চক্রাকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। প্রকৃতিতে বর্জ্য বলে কোনো জিনিস নেই। সবকিছুই চক্রাকারভাবে আবর্তিত হচ্ছে। প্রাথমিক কৃষিপণ্য, বিশেষ করে কৃষির কাঁচামাল থেকে মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি করতে না পারলে আমরা দরিদ্রই থেকে যাব। আমাদের কৃষিতে দুয়েকটি অর্থকরী ফসল ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা খুব কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন বিভাগের আওতাধীন সেন্টার ফর মাইক্রোফাইন্যান্সের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিতে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার মাত্র ৬ শতাংশ। বিশেষ করে উদ্যানতত্ত্ব বা হর্টিকালচার খাতে এ হার আরও কম।

2

আমাদের দেশে ফসল উৎপাদন তিন গুণ বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদনের উপকরণ ও অন্যান্য খরচও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে কৃষকের মুনাফা বাড়ছে না। কৃষকেরা সন্তানদের লেখাপড়া শেখান, যাতে তারা কৃষিকাজে না থেকে অন্য পেশায় যেতে পারেন। কারণ, কৃষিতে উৎপাদনশীলতা কম এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সুযোগও তুলনামূলকভাবে কম। আমাদের চিন্তা হলো, কৃষকের মুনাফা কীভাবে বাড়ানো যায়। এর একটি উপায় হচ্ছে প্রাথমিক কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ানো। আর চাহিদা বাড়াতে হলে এসব পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং মূল্য সংযোজন করতে হবে।

ঢাকা মেইল: আম ও কাঁঠালের মতো প্রচলিত কৃষিপণ্য থেকে নতুন পণ্য তৈরির কী সম্ভাবনা রয়েছে?

মো. ফজলুল কাদের: আমাদের দেশে এখন আমের উৎপাদন বাড়ছে। আগে মূলত রাজশাহী অঞ্চলে আমের উৎপাদন বেশি হলেও এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলেও আমের চাষ হচ্ছে। ফলে বাজারে আমের সরবরাহ বাড়ছে এবং অনেক সময় দাম কমে যাচ্ছে। কিন্তু এটিকে আমরা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারি। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, আমের খোসা গাঁজন প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করে অ্যালকোহলমুক্ত পানীয় তৈরি করা সম্ভব। আবার আমের শাঁস থেকে এমন পাল্প তৈরি করা যায়, যা কোনো সংরক্ষণকারী উপাদান ছাড়াই ছয় মাস পর্যন্ত ভালো থাকে। প্রয়োজনের সময় এটি ব্যবহার করে আমের জুস তৈরি করা যাবে। রাস্তার পাশের ছোট ব্যবসায়ীরাও এই পাল্প ব্যবহার করে জুস বিক্রি করতে পারবেন। আম থেকে ভিনেগার তৈরিরও সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ আমের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য তৈরি করা সম্ভব।

কাঁঠালের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা রয়েছে। ৫০০ টাকার একটি কাঁঠালে আরও ৫০০ টাকা বিনিয়োগ করে ঘন জুস বা কনসেনট্রেট তৈরি করা সম্ভব। প্রাথমিক হিসাবে সেটি প্রায় ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যেতে পারে। কাঁঠালের বাইরের আবরণ পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আবার মাঝখানের অংশ থেকে পেকটিন তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ একটি কাঁঠাল থেকেই একাধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি করা যায়।

ঢাকা মেইল: মাছের আঁশ থেকে জিলাটিন তৈরি করা গেলে কী ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে?

মো. ফজলুল কাদের: মাছের আঁশের ক্ষেত্রেও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে মাছের আঁশ রপ্তানি করে আমরা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয় করি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এই মাছের আঁশ থেকেই জিলাটিন তৈরি করা হয়। জিলাটিন ওষুধ ও খাদ্যশিল্পের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। বাংলাদেশেই জিলাটিন উৎপাদন করা সম্ভব। আমরা যদি দেশে জিলাটিন তৈরি করতে পারি, তাহলে ৩০০ কোটি টাকার পরিবর্তে এ খাত থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে ওষুধ ও খাদ্যশিল্পের প্রয়োজনীয় উপাদান উৎপাদন করা যাবে।

ঢাকা মেইল: কৃষি ও প্রাণিজ বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে পিকেএসএফের উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ রয়েছে?

মো. ফজলুল কাদের: সাতক্ষীরার একটি এলাকায় ঘোষদের গ্রামে গোবরের ব্যাপক সমস্যা ছিল। পুকুর পর্যন্ত গোবরে ভরে গিয়েছিল। আমরা এলাকাটিকে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদনের এলাকায় পরিণত করার উদ্যোগ নিই। এখন ওই গ্রামের গোবর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৫০ টন ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি শুধু একটি গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পিকেএসএফের অবদানে দেশে বছরে ২ লাখ টনের বেশি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদিত হচ্ছে।

3

এর ফলে কৃষিজমির উর্বরতা বাড়ছে। কৃষকেরা বিশেষ করে সবজি উৎপাদনে এর সুফল পাচ্ছেন। জৈব সারের ব্যবহার বাড়লে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা এবং ইউরিয়া সারে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরিবেশের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেটিও কমানো যাবে। ভার্মি কম্পোস্টের ব্যবহার বাড়লে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতেও ভূমিকা রাখা সম্ভব।

ঢাকা মেইল: ছানা তৈরির পর ফেলে দেওয়া পানিরও কি অর্থনৈতিক ব্যবহার রয়েছে?

মো. ফজলুল কাদের: ছানা তৈরির পর যে পানি ফেলে দেওয়া হয়, সেটিকে আমরা সাধারণত বর্জ্য হিসেবে দেখি। অথচ এতে হুই প্রোটিন রয়েছে। আমাদের দেশে বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি হুই প্রোটিন আমদানি করা হয়। যারা জিমে ব্যায়াম করেন, তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ প্রোটিনের ব্যবহার রয়েছে। আমরা দেশের খাদ্যপ্রযুক্তিবিদদের সহায়তায় ছানার পানি থেকে একটি প্রোটিনসমৃদ্ধ পানীয় তৈরি করেছি। এটি বিএসটিআইয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য এটি ভালো হতে পারে। আমাদের দেশে প্রোটিনের ঘাটতি রয়েছে। অথচ প্রোটিনসমৃদ্ধ একটি উপাদান আমরা নষ্ট করছি। বাণিজ্যিকভাবে পানীয় উৎপাদন করতে পারলে একদিকে পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

ঢাকা মেইল: কৃষিপণ্য ও অন্যান্য উপকরণে মূল্য সংযোজন হলে কর্মসংস্থানের প্রভাব কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে?

মো. ফজলুল কাদের: একটি পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে শুধু মূল উৎপাদকই যুক্ত থাকেন না। এর কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিপণন ও বিক্রির সঙ্গে আরও অনেক মানুষ যুক্ত হন। এটিই ফরোয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ। একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগের সঙ্গে উৎপাদনের আগে ও পরে নানা ধরনের শিল্প ও সেবার শাখা-প্রশাখা জড়িয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগে একজন মানুষের কর্মসংস্থান হলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফরোয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের মাধ্যমে মোট কর্মসংস্থান ৩ থেকে ৩ দশমিক ৮ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। আমি আরও সতর্ক হিসাব করে সাড়ে তিন গুণ ধরেছি। অর্থাৎ একজনের কর্মসংস্থান হলে সংশ্লিষ্ট পুরো ব্যবস্থায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। এভাবেই মোট কর্মসংস্থানে একটি মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট বা গুণিতক প্রভাব তৈরি হয়।

তাই মূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে গেলে আমরা এই সুফল পাব। এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। এর পাশাপাশি আমরা নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই। যেমন বনসাইয়ের কথা বলা যায়। বিশ্ববাজারে বনসাইয়ের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে। আমাদের দেশের নারীরা কিছু প্রশিক্ষণ নিয়ে ঘরে বসেই এ কাজ করতে পারেন। বিশ্ববাজারের ১০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে আমরা যদি ৫০০ মিলিয়ন ডলারও নিতে পারি, অর্থাৎ ৫ শতাংশ বাজার দখল করতে পারি, তাহলেও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। এর সঙ্গে বনসাইয়ের টব ও অন্যান্য উপকরণ তৈরি এবং সরবরাহের জন্যও নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠবে।

নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির আরেকটি ক্ষেত্র হচ্ছে হস্তশিল্প। উলু থেকে ফাইবার তৈরি হয়, যার বেশ চাহিদা রয়েছে। হোগলা ও কচুরিপানা থেকেও বিভিন্ন পণ্য তৈরি হচ্ছে। এসব পণ্য বিশ্ববিখ্যাত কিছু ব্র্যান্ডের দোকানেও যাচ্ছে। আবার আনারসের পাতা থেকেও ফাইবার তৈরি হচ্ছে। এসব ফাইবার ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করা যায়। আমি মনে করি, এ খাতের রপ্তানি সম্ভাবনা প্রায় বিলিয়ন ডলারের। এখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির খরচও প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কারণ, গ্রামের একজন নারীকে গার্মেন্টসের মতো কাজের জন্য শহরে নিয়ে আসতে হয় না। মূল প্রি-ফিনিশড পণ্য তৈরির কাজ গ্রামের মানুষ ঘরে বসেই করতে পারেন। শুধু চূড়ান্ত পর্যায়ে ফিনিশিং দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কেন্দ্রে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

আমাদের দেশে ইতোমধ্যে এ ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে সব মিলিয়ে এ খাতের রপ্তানি আয় হয়তো ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার মধ্যে। তবে সম্ভাবনা অনেক বেশি। এসব পণ্যের কাঁচামাল দেশীয় হওয়ায় রপ্তানি আয়ের পুরো মূল্যই দেশের আয় হিসেবে যুক্ত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১০০ টাকার কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করে ১৩০ টাকায় পণ্য রপ্তানি করলে প্রকৃত নিট রপ্তানি আয় হয় ৩০ টাকা। কিন্তু দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে ১০০ টাকার পণ্য রপ্তানি করলে পুরো ১০০ টাকাই দেশের নিট রপ্তানি আয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের উদ্যোগ আয়বৈষম্য কমাতেও সাহায্য করবে। কারণ, এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয় অনেক মানুষের মধ্যে বণ্টিত হয়।

৪

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করে ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাত। কিন্তু এ খাতের কর্মসংস্থানের মান সব সময় ভালো নয়, অনেক ক্ষেত্রে আয় কম। তাই এসব উদ্যোগকে বিভিন্ন মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রশিক্ষণ, বিপণন ও মানসম্মত পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাহলে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও চীনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মতো বিশ্ববাজারে যেতে পারবেন। হাতে তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম রপ্তানিকারক দেশ হতে পারে। এ ধরনের পণ্যের বিশ্বব্যাপী বিশাল বাজার রয়েছে। প্রতিযোগিতা থাকলেও বাংলাদেশের কিছু তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন উপাদান থেকে এসেনশিয়াল অয়েল তৈরি করা সম্ভব। পাহাড়ি অঞ্চলে প্রচুর লেবু নষ্ট হয়। অথচ এসব লেবু থেকে ঘন লেবুর পানীয়ের উপাদান তৈরি করা যায়, যার বিশ্ববাজারেও চাহিদা রয়েছে।

ঢাকা মেইল: আপনারা ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য ২ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের কথা ভাবছেন। বিশেষ করে মধ্যবর্তী পণ্য বা ইন্টারমিডিয়েট গুডস তৈরির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থায়নের প্রয়োজন কেন?

মো. ফজলুল কাদের: ভৈরবের জুতার ব্যবসায়িক গুচ্ছের কথা বলা যায়। সেখানে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার ছোট ছোট কারখানা রয়েছে। কোনো কারখানায় পাঁচজন কাজ করেন, আবার কোনো কারখানায় ৬০ থেকে ৭০ জন পর্যন্ত কাজ করেন। এসব কারখানার একটি সাধারণ সমস্যা ছিল—জুতা তৈরির সময় যে বর্জ্য বা ঝুট তৈরি হয়, সেগুলো জমে থাকত। এগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনা করা পরিবেশের জন্য সমস্যা তৈরি করছিল। আমরা চিন্তা করলাম, এসব কারখানায় জুতার সোল বা তলা আমদানি করতে হয়। অথচ জুতা তৈরির বর্জ্য বা ঝুট থেকেই সোল তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু সোল তৈরির জন্য তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ কারণে আমরা প্রথমে দুজন উদ্যোক্তাকে প্রণোদনা দিয়ে স্বল্প সুদে ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করলাম। তারা সফল হলেন।

এরপর আমরা দেখতে চাইলাম, আমাদের সহায়তা ছাড়াও অন্য উদ্যোক্তারা এ ধরনের উদ্যোগ নেন কি না। দেখা গেল, আমাদের সহায়তায় গড়ে ওঠা দুটি উদ্যোগের সাফল্য দেখে উৎসাহিত হয়ে সেখানে আরও কয়েকজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করেছেন। তারা আমাদের সহায়তা ছাড়াই এ কাজ করছেন। এখানে সোল কোনো চূড়ান্ত পণ্য নয়। এটি জুতা তৈরির একটি মধ্যবর্তী উপাদান বা ইন্টারমিডিয়েট প্রোডাক্ট। এ ধরনের পণ্য তৈরিতে বিশেষ যন্ত্রপাতি দরকার হয়, যার জন্য বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে এই বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় না। এ কারণেই আমরা অর্থায়নের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি।

এর ফলে সেখানে সোলের দাম কমে গেছে। জুতার কারখানার কাছাকাছি সোল তৈরি হওয়ায় পরিবহন খরচও কমেছে। পাশাপাশি উৎপাদিত সোলের দাম আগে বিদেশ থেকে আমদানি করা সোলের তুলনায় কম। এতে সোল উৎপাদনকারী উদ্যোক্তা এবং যারা সোল কিনে জুতা তৈরি করছেন, উভয়ই লাভবান হচ্ছেন। এর পরিবেশগত প্রভাবও ইতিবাচক। আগে যে ঝুট বা বর্জ্য জমে থাকত, এখন তা কাজে লাগছে। আমি যতটুকু শুনেছি, ভৈরবের কারখানাগুলোর বর্জ্য দিয়ে এখন আর তাদের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ঢাকার জুতা তৈরির ব্যবসায়িক গুচ্ছগুলো থেকেও বর্জ্য সংগ্রহ করে ভৈরবে নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৩০টি ক্ষেত্রে পরীক্ষা করেছি। এগুলো সবই ভালোভাবে চলছে।

আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ইটের বিকল্প হিসেবে তৈরি পরিবেশবান্ধব ব্লক বা ইকো-ব্লক। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এ ধরনের ব্লক তৈরির জন্য প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয়। এসব ব্লকের ওজন তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যায়। ঢাকার কেন্দ্রীয় কোনো কারখানা থেকে নির্মাণস্থলে এসব ব্লক নিয়ে যেতে খরচ বেশি পড়ে। এ সমস্যার সমাধানে আমরা এমন কিছু মোবাইল ইউনিটের উদ্যোগ নিয়েছি, যেগুলো নির্মাণস্থলের কাছাকাছি গিয়ে উৎপাদন করতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। পাশাপাশি নির্মাণস্থলের কাছে ব্লক তৈরি হওয়ায় পরিবহন খরচও অনেক কমে যাচ্ছে।

এসব ব্লক বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত কারিগরি বৈশিষ্ট্য ও মান অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়েছে। আমরা প্রথমে এ ধরনের মাত্র দুটি ইউনিটের সহায়তা দিয়েছিলাম। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের প্রায় ৫৪টি ইউনিট গড়ে উঠেছে। এগুলো বিভিন্ন নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করছে। ব্লক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে এটি চূড়ান্ত পণ্য হলেও বৃহত্তর নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে এটি ঘরবাড়ি তৈরির একটি উপাদান। এভাবেই বিভিন্ন খাতে মধ্যবর্তী পণ্য তৈরি এবং মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এএইচ/এআর