বোরহান উদ্দিন
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫২ এএম
বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন দিয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এমন ঘোষণার পরও সক্রিয় হয়ে ওঠে দালালচক্র ও অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি। আর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গুনতে হয় বাড়তি টাকা। তাই শুধু ঘোষণা বা প্রজ্ঞাপন নয়, বিনামূল্যে কর্মী পাঠানোর পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের আর্থিক শোষণ থেকে রক্ষায় সরকারের করণীয় কী-এসব বিষয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিন।
ঢাকা মেইল: সরকার মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের বিনা খরচে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের ঘোষণার পরও মধ্যস্বত্বভোগীরা, নানা অজুহাতে কর্মীদের কাছ থেকে আদায় করেন। এমন অবস্থায় কেবল সরকারের এই ঘোষণাই কি যথেষ্ট, নাকি আরও দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন?
আসিফ মুনীর: সরকার সম্প্রতি যে প্রজ্ঞাপন বা সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটিকে কিছুটা সাময়িক বা প্রাথমিক ঘোষণা বলে মনে হচ্ছে। কারণ কেবল এ ধরনের একটি প্রজ্ঞাপন জারি করলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকারের কোনো ইতিবাচক ঘোষণা আসার পরপরই সুবিধাভোগী সিন্ডিকেট ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো পর্দার আড়ালে বা প্রকাশ্যে কর্মীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সা লেনদেন শুরু করে দেয়। শেষ পর্যন্ত সাধারণ প্রবাসীরা অতিরিক্ত অর্থ দিয়েই দেশটিতে যেতে বাধ্য হন।
ঢাকা মেইল: সরকারের এই উদ্যোগকে প্রকৃত অর্থে শ্রমিকবান্ধব করতে এবং কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আর কী কী বিষয় পরিষ্কার ও সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন?
আসিফ মুনীর: বিনামূল্যে কর্মী পাঠানোর পুরো রিক্রুটমেন্ট প্রসেস বা কাজের প্রক্রিয়াটি কী হবে, তা পরিষ্কার করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রেস বার্তা বা নির্দেশিকা আকারে জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। খরচের দায়িত্ব নিয়োগকারী কোম্পানি কীভাবে বহন করবে, বাংলাদেশ অংশে প্রসেসিং ফি কে দেবে এবং কোন কোন এজেন্সি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে-তা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য রাখা জরুরি।
ঢাকা মেইল: ইতোমধ্যে এজেন্সিগুলোর স্থানীয় এজেন্টরা আগ্রহীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে টাকা-পয়সা সংগ্রহ শুরু করেছে। কীভাবে এসব বন্ধ করা যায়?
আসিফ মুনীর: দালাল ও অনিয়মকারী এজেন্সির অপপ্রচার বন্ধ করতে সরকারের নিজস্ব প্রচার মাধ্যম ও প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার করতে হবে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ অভিবাসনপ্রত্যাশীরা যেন কোনো অবৈধ লেনদেনের ফাঁদে না পড়েন, সে জন্য বিএমইটি (BMET) ও জেলা কর্মসংস্থান অফিসগুলোর মাধ্যমে সঠিক তথ্য দ্রুত মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া দরকার।
কোনো এজেন্সি বা মধ্যস্বত্বভোগী যদি বিনামূল্যে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে বা গ্রহণ করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও নজরদারিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ও বাস্তবায়ন দেখতে হবে। একটি স্পষ্ট ও কঠোর মনিটরিং ফ্রেমওয়ার্ক ছাড়া কেবল নীতিগত ঘোষণা বা প্রজ্ঞাপন দিয়ে প্রবাসীদের শোষণমুক্ত রাখা সম্ভব নয়।
ঢাকা মেইল: দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে আর কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
আসিফ মুনীর: বর্তমানে রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালাল চক্র তাদের স্বার্থে প্রবাসীদের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়। এই নির্ভরতা কমাতে সরকারি সেবা বা কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ‘রিসার্চ সেল’ গঠন করা দরকার, যা বিশ্ব শ্রমবাজারের চাহিদা ও সত্য তথ্য নিরূপণ করবে।
কোন দেশে কী যোগ্যতা প্রয়োজন, প্রসেসিং ফি কত এবং যাওয়ার প্রক্রিয়া কী-তা রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর না ছেড়ে সরকারের নিজস্ব প্রশাসনিক ও প্রচার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসীদের কাছে সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে হবে।
কেবল বিনামূল্যে যাওয়ার নীতিগত ঘোষণা দিলেই হবে না; পুরো রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ার খরচ কে বহন করবে, কোন এজেন্সি যুক্ত থাকবে এবং পদ্ধতি কী হবে-তা পরিষ্কার করে প্রেস বার্তা বা নির্দেশিকা আকারে জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। অসাধু চক্র বা এজেন্সি যাতে গোপনে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন করতে না পারে, সেজন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এছাড়া বিএমইটি (BMET)-এর ডাটাবেজ ব্যবহার করে প্রবাসীদের মোবাইলে এসএমএস বার্তা পাঠানো এবং জেলা পর্যায়ে ‘প্রি-ডিপারচার ওরিয়েন্টেশন’ (PDO)-এর মাধ্যমে সরাসরি সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া দরকার, যেন তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের ফাঁদে না পড়েন।
সর্বোপরি, ব্যক্তিগত বা অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা আনতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক চুক্তি (Bilateral Agreements) সম্পাদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঢাকা মেইল: গুরুত্বপূর্ণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আসিফ মুনীর: আপনাকে ও ঢাকা মেইলকেও ধন্যবাদ।
বিইউ/এমআর