Dhaka Mail Logo

সাক্ষাৎকার

প্রবাসীদের সুরক্ষার পাশাপাশি দরকার দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজার গবেষণা

বোরহান উদ্দিন

১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অস্থিরতায় সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে থাকা লাখো বাংলাদেশি কর্মীর নিরাপত্তা ও জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের তাৎক্ষণিক সুরক্ষা, কূটনৈতিক উদ্যোগ, রেমিট্যান্স প্রবাহের ভবিষ্যৎ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন শ্রমবাজার গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিয়ে ‘ঢাকা মেইল’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিন।

ঢাকা মেইল: সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের নির্দেশনা ও দূতাবাসগুলোর নেওয়া পদক্ষেপ কী যথেষ্ট? এমন পরিস্থিতিতে সরকারের আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন?

আসিফ মুনীর: দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে কর্মীদের সতর্ক থাকা ও স্থানীয় সরকারের নির্দেশ মেনে চলার যে আহ্বান জানানো হচ্ছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে কেবল সাধারণ নির্দেশনাই একজন শ্রমিকের পূর্ণ নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের এখন একটি নিখুঁত ও বস্তুনিশ্চিত ‘নিরাপত্তা বিশ্লেষণ’ (Security Analysis) প্রয়োজন।

হুতিরা কখন কোথায় হামলা চালাবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন। তবে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের। এসব নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পরামর্শ নেওয়া এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি। হুতিরা যেসব ‘সফট টার্গেট’ বা বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনার আশপাশের এলাকায় হামলা চালাচ্ছে, তার কাছাকাছি বাংলাদেশি কর্মীরা আছেন কি না এবং স্থানীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা সক্ষম-তা কূটনৈতিকভাবে জেনে নেওয়া দরকার।

ঢাকা মেইল: প্রবাসীদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে আর কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আসিফ মুনীর: কোভিডকালের মতো একটি সার্বক্ষণিক ‘হটলাইন সার্ভিস’ চালু করা দরকার। জরুরি পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য দূতাবাসের কোনো ‘সেফ হোম’ বা স্থানীয় সরকারের নির্ধারিত নিরাপদ কেন্দ্রগুলোর অবস্থান কর্মীদের স্পষ্ট জানানো উচিত। বিষয়টিকে কেবল প্রথাগত কূটনৈতিক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিরাপত্তার লেন্স দিয়ে দেখতে হবে। সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে জনসমাগমস্থলে ঘোরাফেরা না করার মতো সুস্পষ্ট গাইডলাইন দেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা মেইল: বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও বিদেশগামী কর্মীদের বিমানবন্দরে এসে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আসিফ মুনীর: এটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ বা রুট পরিবর্তনের কারণে শ্রমিকরা যাতে অনিশ্চয়তায় না পড়েন, সে জন্য বিমানবন্দর ও বিএমইটি (BMET)-এর ডাটাবেজ ব্যবহার করে নিবন্ধিত কর্মীদের মোবাইলে নিয়মিত তথ্য ও সতর্কবার্তা পাঠানো যেতে পারে।

Soudi_2
সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে সৌদি আরব থেকে।

এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে ‘প্রি-ডিপারচার ওরিয়েন্টেশন’ (PDO) ও ব্রিফিংয়ে প্রবাসীদের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে হবে। এর ফলে তারা ঢাকায় আসার আগেই ফ্লাইট ও টিকিট সংক্রান্ত সঠিক তথ্য পাবেন এবং বিমানবন্দরে এসে অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তির শিকার হবেন না।

ঢাকা মেইল: চলমান উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশে থাকা প্রবাসীদের পরিবার এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে কীভাবে পড়ছে বলে মনে করেন?

আসিফ মুনীর: মধ্যপ্রাচ্যে তেল-জ্বালানির পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও বিপুল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে, যা বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় ঝুঁকির মুখে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর পড়তে শুরু করেছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে জীবনযাত্রার খরচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেকটাই বেড়েছে। ফলে অনেক প্রবাসী কাজ হারাচ্ছেন কিংবা নতুন কাজের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে প্রবাসীদের দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতা কমে আসবে, যা আমাদের অর্থনীতিতে টানাপোড়েন তৈরি করবে। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধপরিস্থিতি বা বৈশ্বিক অস্থিরতা মাথায় রেখে আমাদের বিকল্প শ্রমবাজার ও কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

ঢাকা মেইল: ঐতিহ্যগত শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ যেভাবে সংকুচিত হচ্ছে, সেখানে নতুন শ্রমবাজার তৈরি ও দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?

আসিফ মুনীর: মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের প্রথাগত কায়িক শ্রমের বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসবে-এটাই বাস্তব। তাই এখন প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতার ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়ার সময় এসেছে। আমরা যাদের ‘দক্ষ কর্মী’ বলছি, অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সনদ না থাকায় বিদেশের বাজারে তারা সঠিক মূল্যায়ন পাচ্ছেন না।

তবে ঝুঁকির পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবে আসন্ন এশিয়া কাপ ও ফিফা বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক মেগা ইভেন্টকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের পরিকাঠামোগত ও প্রযুক্তিভিত্তিক কাজের সুযোগ তৈরি হবে। সেখানে প্রথাগত শ্রমের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতার প্রচুর চাহিদা থাকবে।

ঢাকা মেইল: আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

আসিফ মুনীর: আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো-সরকারি পর্যায়ে শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করার মতো কোনো স্থায়ী ‘রিসার্চ সেল’ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা আগাম অনুধাবন করতে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। বর্তমানে রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর নির্ভরতার কারণে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়। সরকারের নিজস্ব গবেষণা ও প্রচার সক্ষমতা থাকলে প্রবাসীদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য পৌঁছানো সম্ভব হতো।

soudi-1
দেশে এসে বিপাকে পড়েন প্রবাসীরা।

সৌদি আরবের পাশাপাশি কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আধুনিক অর্থনীতির দেশগুলোতে মনোযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নারী কর্মীদের জন্য জর্ডানের বাইরে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও শ্রম কূটনীতি জোরদার করতে হবে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার ভেতরেই কৌশলগত শ্রম কূটনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত।

ঢাকা মেইল: গুরুত্বপূর্ণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আসিফ মুনীর: আপনাকে ও ঢাকা মেইলকে অশেষ ধন্যবাদ। 

বিইউ/এমআর