Dhaka Mail Logo

সাক্ষাৎকার

স্বাস্থ্যখাতকে জনমুখী করতে চাই: ড. এম এ মুহিত

সাখাওয়াত হোসাইন

২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

ড. এম এ মুহিত। একজন গবেষক, চক্ষু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। যুক্ত আছেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও। তার বাবা মরহুম অধ্যাপক ডা. এম এ মতিন ছিলেন দেশের একজন বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ, পাঁচবারের সংসদ সদস্য এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বাবার পথ ধরেই চিকিৎসাসেবা ও রাজনীতিতে যুক্ত হন ড. এম এ মুহিত।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮০ দিন অর্থাৎ ছয় মাস পার করেছেন। এই সময়ে দেশের স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারক হিসেবে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল সরেজমিনে পরিদর্শন এবং প্রযুক্তির সহায়তায় নিয়মিত তদারকি চালিয়ে যাচ্ছেন ড. এম এ মুহিত।

এই ছয় মাসে স্বাস্থ্যখাতের সংকটগুলো কতটা চিহ্নিত করতে পেরেছেন, কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন এবং আগামী দিনে পরিকল্পনাই বা কী-এসব নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন ড. এম এ মুহিত। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে দেশের স্বাস্থ্যখাতকে জনমুখী করতে তার নানা পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জের কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসাইন।

ঢাকা মেইল: দায়িত্ব নেওয়ার আগে প্রথম ১৮০ দিনকে সামনে রেখে যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তার কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন?

ড. এম এ মুহিত: সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলো। শুরু থেকেই আমরা ছয় মাসকে মাইলস্টোন হিসেবে রেখেছিলাম। এই ছয় মাসে আমরা কিছু জিনিস করব এবং সামনের দিনে কিছু জিনিস করার জন্য কাজ এগিয়ে নিয়ে যাব। স্বাস্থ্যখাতের দিকে তাকালেই আমরা দেখব এই ছয় মাসে অর্জন কী? নির্বাচনের ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমরা পরিপূর্ণ করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বাজেট আমরা প্রণয়ন করতে পেরেছি। এটা একটা বিরাট অর্জন। বাজেটের সংকট বহু বছর ধরে বলেছি, কিন্তু আমরা ব্যবস্থা নিতে পারিনি; এই বছর আমরা সেটা করেছি। আগামী পাঁচ বছর প্রতি বছরই আমরা স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়াতে থাকব।

ঢাকা মেইল: দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের স্বাস্থ্যখাতের চিত্র কেমন পেয়েছেন? বিশেষ করে দুর্নীতি, অনিয়ম, চিকিৎসক ও ওষুধ সংকট এবং হাম পরিস্থিতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ড. এম এ মুহিত: এই ১৮০ দিনের আগের ১৮০ দিন নিয়ে চিন্তা করলে বা আগের তিন বছর নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যাবে ওই সময় স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়ম হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাজেট যেটা ছিল দুর্নীতিতেই লুটপাট হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ হয়নি। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সব জায়গাতেই রুগ্ন অবস্থা ছিল। আমরা স্বাস্থ্যখাতে এমন অবস্থা পেয়েছিলাম। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভ্যাকসিন কিনতে ভুলে গিয়েছিল এবং ভ্যাকসিনের কোনো স্টক ছিল না। যার কারণে আমরা হামের প্রাদুর্ভাব দেখলাম। আমরা আসার ১৫ দিনের মধ্যে দেখলাম হামের প্রার্দুভাব হলো এবং সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল। আগে মানুষ স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আসায় এবং হতাশায় ছিল। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পেত না এবং দেখা যেত ডাক্তার নেই। হাসপাতালে ওষুধ লিখে দেওয়া হতো বরাদ্দ থাকলেও মানুষ ওষুধ পেত না।

ঢাকা মেইল: এই বাস্তবতার পর স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার ও বিনিয়োগ নিয়ে আপনাদের অগ্রাধিকার কী?

ড. এম এ মুহিত: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব মানুষের সঙ্গে জড়িত। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন পর্যায়ের হাসপাতাল আমরা পরিদর্শন করেছি এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। সেইসঙ্গে সেবার অবস্থা দেখেছি। স্বাস্থ্যখাতের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। আমরা আসার দুই মাস পর থেকে চ্যালেঞ্জিং বাজেট পেলাম; সেই বাজেট থেকে দুনির্দিষ্ট কিছু কর্মপরিকল্পনা আমরা হাতে নিয়েছি। নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা স্বাস্থ্য বিষয়ে অনেক কথা বলেছি। সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশে আমরা কীভাবে গড়ে তুলব, সেই বিষয়ে ২০টি অঙ্গীকার করেছি। নির্বাচনী ইশতেহার এবং বাজেটের আলোকে স্বাস্থ্যখাতের যে সংস্কার ও বিনিয়োগ দরকার, সেই পরিকল্পনা ১৮০ দিনে আমরা তৈরি করতে সামর্থ্য হয়েছি। স্বাস্থ্যখাতে বড় বড় কাজ আমরা হাতে নিয়েছি, আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিয়ে আসছি। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে, উপজেলা কিংবা জেলায়। ফলে আমরা উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয়েছে প্রত্যেকটি উপজেলায় ১৫১ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল গড়ে তুলব, এটি বিশাল একটি পরিকল্পনা। সেই অনুযায়ী আমাদের জনবল লাগবে, আরো চিকিৎসক নিয়োগ করতে হবে।

ঢাকা মেইল: প্রত্যেক উপজেলায় ১৫১ শয্যার হাসপাতাল, চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে কী ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছেন?

ড. এম এ মুহিত: প্রথম পর্যায়ে বড় কাজ হলো প্রত্যেক উপজেলায় ১৫১ শয্যার হাসপাতাল করা এবং ইতোমধ্যে ডিজাইনের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি জনবলের ক্ষেত্রে ৫ হাজার চিকিৎসক স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে; সে ব্যাপারে পিএসসি কাজ করছে। হাসপাতালে নার্সেরও প্রয়োজন আছে, ইতোমধ্যে ১ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সামনে আমরা আরো নতুন নার্স নিয়োগ দেব। ১৮০ দিন হিসেবে এগুলো অনেক বড় বড় কাজ এবং সুপরিকল্পিতভাবে আমরা এগাচ্ছি। আমাদের বড় কাজ হলো ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিদিনের স্বাস্থ্যসেবা পূরণ করার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাটাকে ঢেলে সাজাব, সেখানে আমরা হেলথ কেয়ার ইউনিট করব। প্রাথমিক হেলথ কেয়ার ইউনিটে ৯ জন স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করবেন। আমরা নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করব এবং বর্তমানে ৪০ হাজার আছে। এই স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে একটা বক্স কিট দেব এবং মানুষের বাড়িতে বাড়িতে যাবেন; টেকনোলজি ব্যবহার করে ডিজিটালি সংযোগ করব এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা কিছু টেস্ট করবেন। যারা স্বাস্থ্যসেবা চাচ্ছেন তাদের তথ্য সংগ্রহ এবং বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসবেন। আমরা দেশে বর্তমানে মৃত্যু প্রধান কারণ হলো অসংক্রামক ব্যাধি অর্থাৎ ক্যানসার, কিডনি রোগ এবং ডায়াবেটিস ইত্যাদি। অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর দিতে হবে। একইসঙ্গে জনগণকে সচেতন করতে হবে এবং মানুষের জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে ডায়াবেটিস এবং হাইপারটেনশন দূর করতে হবে। এই ব্যাপারে স্বাস্থ্যকর্মীরা বড় ভূমিকা রাখবে।

ঢাকা মেইল: তৃণমূল পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে আরও কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?

ড. এম এ মুহিত: স্বাস্থ্যকর্মীদের যে কিট বক্স দেওয়া হবে, সেখানে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও থাকবে। ইতোমধ্যে আমরা ডিজাইনও করেছি। সেইসঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়েও কিছু পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে আমরা পূর্ণাঙ্গ একটি প্যাথলজি ল্যাব স্থাপন করব। উপজেলার মানুষ যেন সব টেস্ট সরকারি প্যাথলজি ল্যাবে করতে পারবে। একইসঙ্গে আমরা অ্যাম্বুলেন্স পুলের কথা ভাবছি, যারা সারাদেশে কাজ করবে। অ্যাপের মাধ্যমে যেমন গাড়ি এবং মোটরসাইকেল খবর দেওয়া যায়, তেমনি অ্যাপের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্সও খবর দেওয়া যাবে। আমরা চাই প্রযুক্তির ব্যবহার করে তৃণমূল মানুষের কাছে ভালো স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং নানা উদ্যোগ আমরা ছয় মাসে নিয়েছি। সবমিলিয়ে দেশের স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানো হবে। স্বাস্থ্যখাতকে জনমুখী করতে চাই।

ঢাকা মেইল: পরিকল্পনাকে কাজের অর্ধেক বলা হয়। কিছু পরিকল্পনা ছিল স্বল্পমেয়াদী এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদী। আপনাদের কাজে শতাংশের হারে কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন?

ড. এম এ মুহিত: আমরা জনগণের সরকার। মানুষ ভোট দিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছেন। আমরা পাঁচ বছরের জন্য এখানে এসেছি। স্বাস্থ্যখাত এতো বিশাল এবং সমস্যাগুলো এতো প্রকট ও জটিল; সেইসঙ্গে গত ১৭ বছরের জট। বললেই সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু সমাধান হবে না। আমরা যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা করব, তা আজকের জন্য সমাধান করলাম তা কিন্তু নয় এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও তা করা। এখন আমরা যা পরিকল্পনা করছি, ৫ কিংবা ১০ বছর পরও যেন তার চাহিদা থাকে। যার কারণে আমরা উপজেলা লেভেলে ১৫১ বেডের হাসপাতাল করছি। আমাদের প্রতিটি পরিকল্পনাই পাঁচ বছরের জন্য নেওয়া এবং প্রথম বছরটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা নিয়ে কাজ করছি। প্রথম বছরেই প্রতিটি কাজের ভিত্তি তৈরি হবে আগামী তিন-চার বছরে।

ঢাকা মেইল: স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা আপনারা ইতোমধ্যে পেয়েছেন। এসব সুপারিশের মধ্যে কোনগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এবং সেগুলো বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কতটা অগ্রগতি হয়েছে?

ড. এম এ মুহিত: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অনেক কমিশন হয়েছিল, তার মধ্যে একটি হলো স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন। আমরা দুই ধরনের কমিশন দেখেছি, এক ধরনের কমিশন সংবিধান এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সংস্কারের জন্য, সেটা নিয়ে অনেক কথা এবং কাজ হয়েছে; সেগুলোতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলছে। অন্য কমিশনের মধ্যে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে এবং সে পরিমাণে আলোচনা হয়নি; সেইসঙ্গে গুরুত্ব সহকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তুলে ধরতে পারেনি। আমি নিজে যেটা করেছি, সেটা হলো নিজ আগ্রহ থেকে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন দেখেছি; এমনকি প্রতিবেদনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের অনেকেই আমরা সঙ্গে পরিচিত। গত ছয় মাসে বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠক কিংবা আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেছি। কমিশনের অনেক ভালো প্রস্তাবনা আছে, সেগুলো আমরা অবশ্যই আমলে নিচ্ছি।

ঢাকা মেইল: স্বাস্থ্য সংস্কারের ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততার ওপর আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার-এই তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করে কীভাবে স্বাস্থ্য সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চান?

ড. এম এ মুহিত: মনে রাখতে হবে, এই কমিশনটা অনির্বাচিত সরকার দ্বারা মনোনীত এবং কিছু বিশেষজ্ঞ মানুষ ছিলেন। একটা বিষয় তখনই সফল হবে, যখন জনসম্পৃক্ততা থাকবে। মানুষকে সঙ্গে যেটা পরিকল্পনা করা হবে, সেটা সফল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। এই কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ আমরা বিবেচনা করছি। পাশাপাশি আমরা জনগণের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে কাজ করছি। এছাড়া বিশেষজ্ঞ যারা আছেন, তাদের সঙ্গে আরও কথা বলব। দলীয় ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকারনামা সেটা সঙ্গে মিলিয়ে জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় যা কাজে লাগবে, সেগুলো আমরা বাস্তবায়ন করব।

ঢাকা মেইল: সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও টেস্ট বাণিজ্য এখনো বন্ধ হয়নি। দীর্ঘদিনের এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভেঙে স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে কী পদক্ষেপ নেবেন?

ড. এম এ মুহিত: খুবই কঠিন কাজ। সিন্ডিকেটগুলো অনেক শক্তিশালী। গত ১৫-১৭ বছর ধরে এই সিন্ডিকেটগুলো গড়ে উঠেছে। আপনারা বালিশ কাণ্ডসহ নানা কাণ্ড শুনেছেন। এখন সেই বালিশ নেই এবং সেই শাসক নেই। কিন্তু কাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তারা এই দেশের মানুষ এবং তারা এখনো রয়ে গেছেন। সিস্টেমের ভেতরেও অনেকে রয়ে গেছেন। ফলে সুশাসন এবং গণতন্ত্র পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। গণতন্ত্র যেহেতু এসেছে এবং ধীরে ধীরে আমরা সুশাসনের দিকে যাব। একই কথা ১৭ বছরের জঞ্জাল ১৭ মাসেও শেষ হবে, এটা ভাবলে হবে উচ্চাভিলাসী পরিকল্পনা। সময় লাগবে এবং সুশাসনের জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো করতে হবে। কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসনের একটা পথ হলো বিভিন্ন দেশে অটোমেশন। আমরা যত পারি, আমাদের টেন্ডারগুলো ই-টেন্ডার করতে এবং আছে। আমরা স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে চাই। সেইসঙ্গে কে কোন সিদ্ধান্তটা দিচ্ছে, এটা যদি জানার সুযোগ থাকে; তাহলে দুর্নীতি রোধে কাজ হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো দেশের মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতে হবে। তাহলে আমরা যেমন জনসম্পৃক্ততা পাব এবং আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সাহস করব।

ঢাকা মেইল: দুর্নীতি রোধে চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নে অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নার্সদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অটোমেশন পুরোপুরি বাস্তবায়নে আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

ড. এম এ মুহিত: এর আগে অটোমেশন ব্যবহার হয়েছে। শেষবার নতুন বিসিএসের মাধ্যমে যেসব চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের পদায়ন অটোমেশনে হয়েছে। অটোমেশনের কাজ চলছে। এরপরও পদায়নের বড় অংশ অটোমেটেড হচ্ছে না। যেটা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা এবং সমালোচনা আছে। আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে ডাক্তার হাজিরা এবং ডাক্তারদের পদায়ন অটোমেশনে নিশ্চিত করা হবে। ধাপে ধাপে আমরা এগুলো বাস্তবায়ন করছি।

ঢাকা মেইল: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় সাড়ে ৭ হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দিলেও তাদের অনেকের পদায়ন করা হয়নি। এর মধ্যে কাউকে কাউকে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে চিকিৎসকদের মধ্যে পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনে বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে কি?

ড. এম এ মুহিত: আমি বলতে চাচ্ছিলাম না, প্রশ্নের মাধ্যমে বারবার উঠে আসছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা। হামের ক্ষেত্রের ভালো কিছু চিন্তা করে কাজ শেষ করে যায়নি। টিকা কেনা হয়নি বলে হাম হয়েছে। এখানেও তাই। তাদের চিন্তার শুরুটা হয়তো ভালো ছিল। তাদের অদক্ষতা সিদ্ধান্তগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তারা আড়াই বছর ছিল এবং আমরা মাত্র ছয় মাস হলো আসছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পদোন্নতিগুলো বিপুল হারে দেওয়া হয়েছিল এবং অনেক পদোন্নতির পদই নাই এবং পদায়ন হবে কীভাবে? পদ ছাড়াই পদোন্নতি দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা যে অব্যবস্থাপনাটা করে গেছে, সেটার জের আমাদের টানতে হচ্ছে। যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তারা বলেন, আমাদের তো পদোন্নতি দিয়েছেন এবং কাজ করার পদ দেন। তারা এটা ঠিক করেননি। এই ছয় মাসে রেখে যাওয়া অব্যবস্থাপনা আমরা কিছুটা ব্যবস্থাপনায় আনতে পেরেছি। হাসপাতালগুলোতে আমরা যাই এবং ঘোরাঘুরি করি। এতে কিছু কাজ হয়েছে। হাসপাতালে আগের চেয়ে ডাক্তারদের উপস্থিতি বেড়েছে। এখন হাসপাতালগুলোতে কম ময়লা দেখা যাচ্ছে। এখনো অনেক দূর যেতে হবে এবং জনগণ সবকিছু দেখছে। জনগণই বিচার করবেন এবং আমরা চাই দেশের মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাটা তৈরি করতে চাই।

ঢাকা মেইল: চিকিৎসা শিক্ষায় সংস্কার এবং চিকিৎসক ও নার্সদের পেশাগত মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাটা বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে?

ড. এম এ মুহিত: চিকিৎসা শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আমরা স্বাস্থ্যখাতকে যেভাবে তৈরি করতে চাই, তাতে যে জনবল প্রয়োজন, তা চিকিৎসা শিক্ষার মাধ্যমেই আসবে। সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে যেসব ডাক্তার বের হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগ মেডিকেলের ডাক্তাররা দেশে এবং বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। আরও ডাক্তারের প্রয়োজন। এর পাশাপাশি নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। নার্সদের প্রশিক্ষণ দিতে পারলে তাদেরকে যে শুধু দেশে কাজে লাগানো যাবে তাই নয়, বিদেশেও তারা কাজে লাগবেন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং টেকনিশিয়ান যারা বড় বড় মেশিন চালান এবং সিটি স্ক্যান ইত্যাদি করেন, তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে কাজ করার জন্যও স্বাস্থ্যকর্মীদেরকেও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

নতুন করে যেসব রোগ বাড়ছে, ডাক্তার-নার্স সংশ্লিষ্টদের সেই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানো হবে। বিদেশি প্রশিক্ষকরা যেন আমাদের এখানে আসেন। আগে আমরা ট্রেইনিং নিতে বিদেশে পাঠাতাম এবং এখন চাই ভালো প্রশিক্ষকরা এখানে আসবেন। বিদেশি প্রশিক্ষকরা আসবেন এবং ১০-১৫ দিন থেকে একটা টিমকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আরেকটা বড় দিক হলো গবেষণা। আমাদের দেশে গবেষণার এতো সুযোগ থাকার পরও সে পরিমাণ মেডিকেল রিচার্চ হয় না। গবেষণার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সরকার এবার বিশেষ বরাদ্দ রেখেছে। গবেষণায় আগের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। রোবটিক্স সার্জারির মতো উন্নত প্রযুক্তি দেশে আনা এবং সহজ করা হবে।

ঢাকা মেইল: দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে স্বাস্থ্যখাতের কাজ করতে গিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কী কী বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন? এসব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল সমস্যাগুলো কতটা গভীরভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন?

ড. এম এ মুহিত: অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে এবং এখনো করছি। দায়িত্বে আসার ১৫ দিনের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব এবং সামনে ডেঙ্গু রয়েছে; এটা গেল অসুখ-বিসুখের বিষয়ে। এছাড়া সিস্টেমেরও অসুখ রয়েছে, সেটা আমরা এবং জনগণ প্রতিদিন মোকাবিলা করছি। আমাদের হেলথ সিস্টেমটা ঠিক মতো কাজ করছে না। দেশের মানুষ কী চায়? অসুখ হলে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা চায় এবং দালালের খপ্পরে পড়তে চায় এবং ওষুধ নিতে চায় হাসপাতাল থেকে। সেইসঙ্গে ডাক্তারের রুমে গেলে ডাক্তারকে রুমে দেখতে চায়। প্রেসক্রিপশনে চারটা ওষুধ লেখা থাকলে সরকারি হাসপাতাল থেকে অন্তত দুটি ওষুধ নিতে চায়। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বাথরুমে গেলে যেন বাথরুমটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখতে পারে। সেইসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি হলে খাবারটার মান যেন ভালো থাকে এবং বিছানায় যেন ছারপোকা না থাকে। মানুষ শেষ পর্যন্ত এই জিনিসগুলোই চায়। এটার জন্যই অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রত্যেকটি অব্যবস্থাপনার পেছনে কোনো একটি গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে এবং বৃহত্তর জনবলের ক্ষতি হচ্ছে। ডাক্তারা সময়মতো হাসপাতালে যেতেন না, সেটা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। তবে আমাদের ডাক্তারদের নিয়েই কাজ করতে হবে। ডাক্তাররা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রাণ।

ঢাকা মেইল: আগামী দুই বছরের মধ্যে আমরা কী দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাব?

ড. এম এ মুহিত: এটাই আশা করি। হাসপাতালগুলো আর আগের মতো দেখা যাবে না। সবাইকে সচেতন এবং সতর্ক করা হবে। সিস্টেমের পরিবর্তন হবে এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করব।

ঢাকা মেইল: দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। সাপের কামড়ের প্রতিষেধক অ্যান্টি-স্নেক ভেনমও আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশে অ্যান্টি-স্নেক ভেনম উৎপাদনের কোনো পরিকল্পনা কি সরকারের রয়েছে?

ড. এম এ মুহিত: এন্টি স্নেক ভেনমটা আমাদের গ্রামে-গঞ্জে অনেক চাহিদা। কারণ অনেক মানুষ সাপের কাটার শিকার হচ্ছেন। এখন দুটি দিক রয়েছে, আমরা কী শুধু ওষুধ আনবো নাকিং প্রতিরোধের দিকেও যাব। সাপের কামড়ে এতো মানুষ আক্রান্ত হয় এবং এটা কিছুটা হলেও প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। আর এন্টি স্নেক ভেনমটা খুবই দামি, এটা আনতে হয় বিদেশ থেকে। এখানেও আমরা চ্যালেঞ্জের কথা বলছিলাম। গত ছয় মাসে অসংখ্যবার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। গত ছয় মাসে কোথাও এন্টি স্নেক ভেনম সাপ্লাই দিতে অসুবিধা হয়নি। এতে সরকারের বিপুল খরচ হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে কাজ করার জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছি, রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে আরও শক্তিশালী করা। এই গবেষণাগুলো একটু সময়সাপেক্ষ এবং সময় লাগবে। তবে আমরা ক্ষেত্র তৈরি করছি।

পাশাপাশি আমাদের ফার্মাসিটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি অনেক সুনাম করছে। বিভিন্ন ওষুধপত্র তারা তৈরি করছে। এই ইন্ডাস্ট্রিও নতুন সময়ে নতুন কিছু করবে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ইন্ডাস্ট্রিগুলোকেও করতে হবে। ড্রাগ তৈরি করা থেকে শুরু করে দোকানে পৌঁছানো পর্যন্ত আপনাদের অবদান। এখানে অনেক বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। আমরা নীতিগত সহায়তা দিয়ে সহযোগিতা করছি। ইন্ডাস্ট্রিগুলোও গবেষণায় নিযুক্ত হতে পারে। বিপুল সম্ভাবনা এই খাতে দেখছি।

ঢাকা মেইল: তৃণমূল চিকিৎসক সংকট অনেক। পিএসসির মাধ্যমে কবে নাগাদ নিয়োগ দেখতে পাব?

ড. এম এ মুহিত: পিএসসির মাধ্যমে এই নিয়োগটা দেওয়া হবে। পিএসসির মাধ্যমে বিসিএস হতে সময় লাগবে। এটা বিশেষ বিসিএস হবে। ইতোমধ্যে আমরা পিএসসিকে অবগত করেছি। আমরা নতুন নিয়োগটা চাই এবং সরকার অনুমোদন দিয়েছে। এখন পিএসসি যে কয়েকমাস সময় লাগে। কয়েক মাসের মধ্যে আশা করি নিয়োগ কাজ শুরু হবে এবং প্রক্রিয়াগুলোও অনুসরণ করতে হয়।

এসএইচ/এমআর