Dhaka Mail Logo

সাক্ষাৎকার

‘শুধু ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়নি’

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান হয়নি বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের পতনের মাধ্যমে কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে; কিন্তু দমন-পীড়ন, দলীয়করণ, দখলদারিত্ব এবং ভিন্নমত দমনের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো বহুলাংশে বহাল রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কার, আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট বিচার, রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা এবং রাজনীতিতে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে ঢাকা মেইলৈর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মেহেদী হাসান হাসিব

ঢাকা মেইল: ৫ আগস্টের পর দুই বছর পেরিয়ে গেল। যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ আন্দোলনে নেমেছিল, তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

মনিরা শারমিন: আমরা যে ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা চিন্তা করেছিলাম, সেই আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অবশ্যই হয়নি। তবে পরিবর্তন আনা কঠিন—এটিও সত্য। শুরুতে ছাত্ররা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। পরে আন্দোলনটি শুধু কোটা বা বৈষম্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি অধিকারভিত্তিক আন্দোলনে রূপ নেয়। দীর্ঘমেয়াদে আমাদের প্রত্যাশা ছিল ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান এবং নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, খুব বেশি পরিবর্তন আমরা করতে পারিনি। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি এসেছে—মূলত এই পরিবর্তনটাই দৃশ্যমান। অথচ আমরা চেয়েছিলাম বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়নের সংস্কৃতি বন্ধ হবে, গুম, খুন, মামলা ও হয়রানির রাজনীতি থেকে দেশ বেরিয়ে আসবে। সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে জনগণের জন্য নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। কিন্তু মৌলিক সেই সংস্কারগুলো এখনো হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তনের আশা ছিল, তা দেখা যাচ্ছে না। এখনো বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠছে। ৫ আগস্টের পর রাজনীতিতে আসা নতুন প্রজন্মের অনেকের বিশ্বাস ছিল, রাজনীতি আর পুরোনো পথে ফিরবে না। কিন্তু সেই বিশ্বাস কতটা ধরে রাখা গেছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ঢাকা মেইল: তাহলে কি আপনি মনে করেন, ৫ আগস্ট ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি?

মনিরা শারমিন: আকাঙ্ক্ষার জায়গাটি অনেক বড় ছিল। মানুষের প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। কিন্তু সরকার যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়া এখন অনেক কঠিন বলে মনে হচ্ছে। আমরা যে রাজনৈতিক সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলাম, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনেক কিছুই এখনো বহাল রয়েছে।

Julay33

ঢাকা মেইল: ৫ আগস্টের চেতনা ও গণঅভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য কতটা জরুরি?

মনিরা শারমিন: ঐকমত্য অত্যন্ত জরুরি। ৫ আগস্টের পর আমরা ঐক্য ধরে রাখার জন্য অনেক সময় ও প্রচেষ্টা দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পুরোনো বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দলীয় স্বার্থের কারণে সেই ঐক্য হতে দেয়নি। বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সংস্কারপ্রক্রিয়াকে গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেন নির্বাচন হয়ে গেলে সংস্কারের প্রয়োজনই শেষ হয়ে যাবে। আমরা ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন অবস্থান ও দলীয় স্বার্থের কারণে প্রয়োজনীয় সংস্কার যতটা দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেওয়া দরকার ছিল, তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঐক্যও তৈরি হয়নি, আবার সংস্কারপ্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো সেই পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়ে গেছে। রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার বড় কারণ হলো—অনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে তা ভুলে যান। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ও জবাবদিহি ছাড়া রাজনীতি টেকসই হতে পারে না।

ঢাকা মেইল: জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ৫ আগস্টের পর রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ কি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেছে?

মনিরা শারমিন: ১৪ জুলাই ২০২৪ সালে হলের গেট থেকে নারী শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে না এলে জুলাই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিত কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নারী শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনের সময় সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছেন। কিন্তু আন্দোলনে নারীরা সামনে থাকলেও রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণের চিত্র ভিন্ন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় নারীদের মধ্যে একধরনের অনিরাপত্তাও তৈরি হয়েছে। সাইবার বুলিং, অনলাইনে হয়রানি, চরিত্রহনন এবং নানা ধরনের আক্রমণের কারণে অনেক নারী রাজনীতিতে আসতে নিরুৎসাহিত হন। কোনো নারী রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলেই তাকে বিভিন্নভাবে আক্রমণ করা হয়। অনেক পরিবারও এসব পরিস্থিতি সহজভাবে নেয় না। রাজনৈতিক দলগুলোর উচ্চপর্যায় থেকেও নারীদের রাজনীতিতে আনা ও নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখা যায় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের উপস্থিতি খুব কম। একটি মঞ্চে ১০ জন পুরুষের বিপরীতে একজন বা দুজন নারী থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—নারীরা কেন রাজনীতিতে আসবেন? আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক নারী অংশ নিলেও তাদের ধরে রাখা যায়নি। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা। আন্দোলনে নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নামেন; কিন্তু পরে তাদের রাজনৈতিকভাবে গড়ে তোলা, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সামনে নিয়ে আসার উদ্যোগ খুবই সীমিত। জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক হিসেবে আমি মনে করি, আমরা সামাজিক নেতৃত্ব তৈরি করার মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে রাজনীতিতে আনার চেষ্টা করছি। আগে সামাজিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে, এরপর প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে তাদের সামনে নিয়ে আসতে হবে। এভাবেই রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব।

ঢাকা মেইল: জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত ঘটনার বিচার ও জবাবদিহির বিষয়ে এনসিপির প্রত্যাশা কী?

মনিরা শারমিন: বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করে। আমরা এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রত্যর্পণসংক্রান্ত চুক্তি থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে সরকার কতটা কার্যকর ও আন্তরিক ভূমিকা রাখছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগের বিষয়ে আমরা স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। বিরোধী দল হিসেবে আমরা এ বিষয়ে দাবি জানাতে পারি। মাঠে এবং সংসদে আমাদের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে কথা বলছেন। আমরা এই দাবি অব্যাহত রাখব।

Julay22

ঢাকা মেইল: ৫ আগস্ট বা আন্দোলনের দিনগুলোর কোন স্মৃতি আপনাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়?

মনিরা শারমিন: ৫ আগস্ট আমি কুষ্টিয়ায় ছিলাম। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিজয় মিছিল বের হলেও সেখানে তখনও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমরা মাঠে থাকা অবস্থায় খবর পাই যে, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু সেই সময়ও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। আমাদের সহযোদ্ধারা বাঁচার জন্য মসজিদে গিয়ে মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছিলেন—ঘরে যারা আছেন, তারা যেন বেরিয়ে এসে আমাদের সাহায্য করেন। চারপাশে আতঙ্ক ছিল। মানুষের জীবন কতটা অনিরাপদ হয়ে পড়েছিল, সেই দৃশ্য এখনো আমাকে নাড়া দেয়।

ঢাকা মেইল: ৫ আগস্ট উপলক্ষে দেশবাসীর কাছে এনসিপির মূল বার্তা কী?

মনিরা শারমিন: দেশের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কার জরুরি। এনসিপি ক্ষমতায় যাবে কি যাবে না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। দেশের রাজনীতি করতে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে হবে। মানুষকে বোকা বানিয়ে, ক্ষমতা ধরে রেখে এবং পুরনো হামলা-মামলা ও দমন-পীড়নের রাজনীতি চালিয়ে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না। মানুষ নতুন ধরনের রাজনীতি দেখতে চায়। তারা এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব চায়, যারা জনগণের কথা বলবে, জবাবদিহি করবে এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেবে। আমরা জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের কথা বলছি। রাজনীতিবিদদের পুরোনো ভুল রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এমএইচএইচ/জেবি