মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
সারাদেশে শুরু হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। সকাল থেকে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইছেন ও নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ভোটের এই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকাতেও। নির্বাচনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর একটি আসন ঢাকা-৫। ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন জামায়াত নেতা মোহাম্মদ কামাল হোসেন। নির্বাচনী মাঠের বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ, উন্নয়ন দর্শন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়ে ঢাকা মেইলের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তারিক আবেদীন ইমন।
ঢাকা মেইল: আপনার নির্বাচনী মাঠের বর্তমান অবস্থা কেমন?
কামাল হোসেন: নির্বাচনী মাঠের অবস্থা মূল্যায়ন করলে আমি বলব-আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের প্রস্তুতি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমে আমরা মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছি। নির্বাচনী প্রচারণা মানে শুধু পোস্টার বা স্লোগান নয়; বরং মানুষের কথা শোনা, তাদের সমস্যার বাস্তব সমাধান নিয়ে ভাবা। সে জায়গা থেকে আমরা এগিয়ে আছি। তবে বাস্তবতা হলো-সব পক্ষ সমান সুযোগ পাচ্ছে না। কিছু প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে আগেভাগে প্রচারণা চালিয়েছেন। তবুও আমি আশাবাদী, কারণ জনগণ এখন অনেক সচেতন। তারা বুঝতে পারছে কে নিয়ম মানে, আর কে নিয়ম ভাঙে। শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ই হবে প্রকৃত বিচার।
ঢাকা মেইল: আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা কেমন দেখছেন?
কামাল হোসেন: নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। কিছু ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয় আমরা প্রশাসনকে অবহিত করেছি। আমি মনে করি, প্রশাসন যদি দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়, তাহলে মাঠের পরিবেশ অনেকটাই স্বাভাবিক হবে। আমার প্রত্যাশা-কেউ যেন ক্ষমতা বা প্রভাব খাটিয়ে বাড়তি সুবিধা না পায়। প্রশাসনের প্রতি আমার আহ্বান, তারা যেন আইনের শাসন সমুন্নত রাখে এবং সকল প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। এতে শুধু নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না, গণতন্ত্রের ভিত্তিও আরো মজবুত হবে।
ঢাকা মেইল: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন?
কামাল হোসেন: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমি সচেতন ও দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে কথা বলছি। কিছু এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা অবশ্যই উদ্বেগজনক। নির্বাচন মানেই উৎসব, সেখানে ভয়ভীতি বা হুমকির কোনো স্থান নেই। সাধারণ ভোটার যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন-এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখতে চাই এবং আশা করি তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে, যেন তারা কর্মীদের সংযত রাখে। সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচন শুধু সুষ্ঠুই হবে না, বরং ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
ঢাকা মেইল: ভোটাররা কেন আপনাকে বেছে নেবেন?
কামাল হোসেন: ভোটাররা এবার পরিবর্তন চায়-এটা আমি মাঠে নেমে স্পষ্টভাবে অনুভব করছি। তারা এমন একজন প্রতিনিধি চান, যিনি সৎ, শিক্ষিত এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কথা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি। আমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি বা সন্ত্রাসের অভিযোগ নেই। আমি রাজনীতিকে জীবিকা নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখি। জনগণের সমস্যা সমাধানই আমার মূল লক্ষ্য। এ কারণেই আমি বিশ্বাস করি, ভোটাররা আমাকে একটি সুযোগ দিতে আগ্রহী।
ঢাকা মেইল: আপনার রাজনৈতিক দর্শনকে মানুষ কতটা পছন্দ করবে?
কামাল হোসেন: আমার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, সততা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ। আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয় না। ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে আমি এমন একটি কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণায় বিশ্বাসী, যেখানে রাষ্ট্র মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে এবং বৈষম্য কমিয়ে আনবে। রাজনীতিকে আমি ইবাদতের অংশ হিসেবেই দেখি-এখানে আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ এবং জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্বাস, আদর্শিক রাজনীতি মানুষকে বিভক্ত করে না; বরং ঐক্যবদ্ধ করে। এই দর্শন নিয়েই আমি দীর্ঘদিন সামাজিক ও সাংগঠনিক কাজ করেছি। সংসদে গেলে আমি একই নীতি অনুসরণ করে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চাই, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ পায়।
ঢাকা মেইল: ঢাকা-৫ আসনের প্রধান সমস্যাগুলো কী বলে মনে করছেন?
কামাল হোসেন: ঢাকা-৫ আসনের সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। প্রথমত, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে জলাবদ্ধতা এখানকার নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল এলাকায় এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা আধুনিক হাসপাতাল নেই, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। তৃতীয়ত, পরিবহন নৈরাজ্য ও দখলদারিত্ব মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। এসব সমস্যার সমাধানে খণ্ডিত নয়, বরং সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আমি মনে করি, সঠিক নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই আসনটিকে একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য এলাকায় রূপান্তর করা সম্ভব।
ঢাকা মেইল: সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে আপনার প্রথম অগ্রাধিকার কী হবে?
কামাল হোসেন: সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে আমার প্রথম অগ্রাধিকার হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। আমি জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে জবাবদিহিমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসন, রাস্তা-ঘাট উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবা সহজীকরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেব। আমার লক্ষ্য থাকবে-সংসদের ভেতরে ও বাইরে মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা। আমি বিশ্বাস করি, একজন সংসদ সদস্য যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধি হন, তাহলে এলাকার বহু সমস্যাই সমাধানের পথে এগিয়ে যাবে।
ঢাকা মেইল: কর্মসংস্থান নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
কামাল হোসেন: কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমার উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ঢাকা-৫ এলাকায় বিপুল শিক্ষিত তরুণ-তরুণী বেকার আছেন। আমি তাদের জন্য প্রশিক্ষণভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে অদক্ষ শ্রমিকদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। এতে একদিকে বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে। আমি বিশ্বাস করি, কর্মসংস্থানই সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।
ঢাকা মেইল: নারীদের ক্ষমতায়ন বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?
কামাল হোসেন: নারীদের ক্ষমতায়ন ছাড়া একটি সমাজ কখনোই পূর্ণাঙ্গভাবে এগোতে পারে না। আমি বিশ্বাস করি, নারীরা শুধু সুবিধাভোগী নন, বরং উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার। ঢাকা-৫ এলাকায় নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পাশাপাশি মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে নারীদের চলাচল নিরাপদ করা আমার অগ্রাধিকার। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নারীদের বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। আমি চাই, নারীরা আত্মমর্যাদার সঙ্গে সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখুক।
ঢাকা মেইল: পরিবেশ ও নদীদূষণ রোধে আপনার পরিকল্পনা কী?
কামাল হোসেন: পরিবেশ ও ঢাকার জলাধার রক্ষা আমার কাছে একটি নৈতিক দায়িত্ব। শিল্পবর্জ্য ও অবৈধ দখলের কারণে ঢাকা শহরের অনেক জলাধার আজ হুমকির মুখে। আমি নির্বাচিত হলে দূষণ রোধে কঠোর নজরদারি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পনীতির পক্ষে কাজ করব। খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ রক্ষা অপরিহার্য-এ বিশ্বাস থেকেই আমি কাজ করতে চাই।
ঢাকা মেইল: ভোটারদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
কামাল হোসেন: আমি ভোটারদের কাছে কোনো অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দিতে আসিনি। আমি এসেছি দায়িত্ব নিতে। আমার কোনো ব্যক্তিগত এজেন্ডা নেই-আছে কেবল মানুষের কল্যাণের স্বপ্ন। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যহীন একটি মানবিক ঢাকা–৫ গড়তে আমি আপনাদের সমর্থন চাই। আপনারা যদি আমাকে দায়িত্ব দেন, আমি আপনাদের আস্থার মর্যাদা রাখব ইনশাআল্লাহ। আমি বিশ্বাস করি, জনগণের ঐক্য ও সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব। সাবাইকে বলব, চলুন একসঙ্গে গড়ি বাংলাদেশ।
টিএই/এমআর