images

সাক্ষাৎকার

‘এমপি হওয়াই লক্ষ্য নয়, সমাজ বদলই আমার অগ্রাধিকার’

বোরহান উদ্দিন, মাহফুজুর রহমান

১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১০ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তরুণ রাজনীতিক তারেক এ আদেল। রাজনীতির পাশাপাশি সংগঠক হিসেবেও পরিচিত তিনি। এর আগে জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপিতে যোগ দেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর জোট থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই আসনের উন্নয়ন, নাগরিক প্রত্যাশা এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক ভাবনা নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন তরুণ এই রাজনীতিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিন ও নিজস্ব প্রতিবেদক মাহফুজুর রহমান

ঢাকা মেইল: তফসিল ঘোষণার পর সামগ্রিকভাবে এখন পর্যন্ত নির্বাচনের প্রস্তুতি কেমন চলছে?

তারেক এ আদেল: আমার প্রস্তুতি খুবই ভালো। আমি আগেও দুটি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলাম। আগের নির্বাচনগুলোতেই আমি মাঠ চষে বেড়িয়েছি। এবারে যেহেতু একটি নতুন দল, গণজোয়ারের মাধ্যমে বৈষম্যহীন রাজনীতির উদ্দেশ্যে দলটি গঠিত হয়েছে, সেটিই আমাকে আকৃষ্ট করেছে। এই ধরনের রাজনীতি আমি পছন্দ করি, যা জাতীয় পার্টিতে ছিল না। জাতীয় পার্টিতে আমি ছিলাম এটি লুকানোর কিছু নেই, জুলাই অভ্যুত্থানের আগেই আমি জাতীয় পার্টি ছেড়েছি। তিনটি টার্ম ধরে যারা ভোট দিতে পারেনি, বিশেষ করে যুবসমাজ, তারা ভোট থেকে বঞ্চিত ছিল, তাদের কাছ থেকে আমি পূর্ণ সাড়া পাচ্ছি।’

আরও পড়ুন

‘মোহাম্মদপুর অঞ্চলকে অপরাধমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছি’

ঢাকা মেইল: বলছিলেন আপনার দলটি নতুন। ৫ আগস্টের আগের গণঅভ্যুত্থানে দেশের পক্ষে এই দলের নেতাদের যে ভূমিকা ছিল, পরবর্তী সময়ে তাদের কারও কারও কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এসবের পরও এই নতুন দল থেকে নির্বাচন করতে নেমে কতটা স্বস্তি নিয়ে মাঠে আছেন?

তারেক এ আদেল: ব্যক্তিগতভাবে পূর্ব পরিচিতির কারণে আমি স্বস্তি নিয়েই মাঠে আছি। বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আলোচনা কম, সমালোচনা বেশি হচ্ছে। নতুন যারা মাঠে নামছে, তাদের মধ্যে ইতিবাচক বক্তব্যের চেয়ে নেতিবাচক কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে। আমি প্রতিপক্ষের দোষ ধরে এগোতে চাই না। আমার নিজস্ব গুণ দিয়েই আমি রাজনীতি করতে চাই, রাজনীতিতে এগিয়ে যেতে চাই। রাতারাতি নেতৃত্ব দিতে বা নির্বাচন করে এমপি হয়ে যেতে চাওয়ার রাজনীতিতে আমি বিশ্বাস করি না। এমপি হওয়া সহজ হলেও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলা বা প্রকৃত নেতা হওয়া কঠিন। গত দুটি টার্ম ধরে আমি কাজ করে আসছি। আমার উদ্দেশ্য শুধু সংসদ সদস্য হওয়া নয়। আমার সাদা টাকা আছে, হোয়াইট মানি আছে, ফাইলে দেখানো আছে। বাংলাদেশে বড় বড় অবকাঠামো লিজ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে যাচ্ছে, এই বাস্তবতা এখনো রয়ে গেছে। গত দুই টার্মে যা হয়েছে, এবারও একই অনুশীলন চলছে। কেন্দ্র থেকে বড় দলগুলোর আধিপত্য, বিদেশফেরত বড় নেতাদের ঘিরে রাজনীতি, এসব দেখে আমি আতঙ্কিত। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে, কয়েকটি মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকায় ঘোরাফেরা করেই নির্বাচন জিতে যাওয়ার সংস্কৃতি এখনো বদলায়নি।

Tareq3
ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তারেক এ আদেল। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মেইল: নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত। প্রধান উপদেষ্টার এমন বক্তব্যের পর একজন প্রার্থী হিসেবে আপনি কতটা আস্থা পাচ্ছেন?

তারেক এ আদেল: প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিলেই রাতারাতি বাস্তবায়ন হবে- এমন কোনো নমুনা আমি এখন পর্যন্ত দেখিনি। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে রাস্তায় হত্যা করা হয়েছে। গণসংযোগে বের হলে যেকোনো সময় আমারও খুন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই দেশে মানুষের জীবনের কোনো দাম নেই। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি উঠলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হবে, এমন আস্থা আমি রাখতে পারছি না।

ঢাকা মেইল: আপনার আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরাও আছেন। আপাতত তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আপনি ব্যক্তিগতভাবে কতটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন?

তারেক এ আদেল: আমি তাদের এক ফোঁটাও চ্যালেঞ্জ মনে করি না। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, খেলাধুলা সবকিছুই এই এলাকায়। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজনের বাড়ি বুড়িগঙ্গার ওপারে, আরেকজনের বাড়ি কুমিল্লায়। শান্তিপূর্ণ ভোট হলে এবং ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের হুমকি না থাকলে আমি শতভাগ নিশ্চিত যে বিপুল ভোটে জয়ী হবো।

আরও পড়ুন

‘যেকোনো মূল্যে নয়, জনগণের রায়েই জয় চাই’

ঢাকা মেইল: জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট বা আসন সমঝোতা হলে, ঢাকার এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে যদি আপনাকে সরে দাঁড়াতে বলা হয় সেক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কী হবে?

তারেক এ আদেল: এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে আসন সমঝোতা হলে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হলে তা করতেই হবে। দলীয় ক্লজ অনুযায়ী আমাকে সরে যেতেই হবে। যেই বিষয়টা ২০১৪ সালে এবং ২০১৮ সালে এরশাদ সাহেবের সঙ্গে হয়েছিল। নির্বাচনে যাতে জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ করে আওয়াম লীগের ইলেকশনটাকে ইস্টাবলিসড করার জন্য, লিগ্যালাইজড করবার জন্য, এরশাদ সাহেবকে তখন বারবার সিএমএইচে নিয়ে যেত। তখন কিন্তু কেউ সাইন করার থাকত না এবং অন্যান্য প্রার্থীরা শেখ হাসিনার আন্ডারে কাজ করে জাতীয় পার্টির পোশাক গায়ে দিয়ে সেই ইলেকশনে তারা বারবার সংসদ সদস্য হয়ে আসতো।

Tareq4
জামায়াত জোটের সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশায় তারেক এ আদেল। ছবি: সংগৃহীত

এইবার তো আর এইরকম সম্ভাবনা নেই, যে নাহিদ ইসলামকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে আর আমরা প্রার্থিতা আমাদেরটা রেখে দেব। তবে সুযোগ থাকলে এনসিপিতে থেকেও এককভাবে নির্বাচন করা গেলে আমি নির্বাচন করব। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে থাকলে এখানে পাঁচজনের লড়াই হবে। যদি বিএনপির দুইজন প্রার্থী থাকে, কামরাঙ্গীরচর এতদিন আমাদের সঙ্গে ছিল না, এখন আমাদের সাথে যোগ হয়েছে, সেখান থেকে যদি মনির চেয়ারম্যান থাকেন, তাহলে তিনি তার ভোট কামরাঙ্গীর চর থেকে পাবেন। তারপরে ইসহাক সরকার যদি থাকেন, বংশাল এই সমস্ত এলাকার এবং যুবক, বিএনপির বেশ কিছু নিপীড়িত কর্মীরা আছেন, তাদের পরিবারের ভোটগুলো ইসহাক সরকার পাবেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমান আছেন, তার ভোট কাটাকাটি হবে। দাঁড়িপাল্লার ভোট সেরকম নেই এখানে। তারা হচ্ছে আমাদের যারা মাদরাসাপড়ুয়া তাদের উপরেই বেইজড করে আছে। কিন্তু যাদের কথা বললাম, এদের চেয়ে আমার আলাদা একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে।

আরও পড়ুন

নিতে আসিনি, মানুষকে দিতে এসেছি: ব্যারিস্টার ফারজানা

ঢাকা মেইল: অন্য প্রার্থীদের তুলনায় নিজেকে কেন আলাদা মনে করেন? ভোটাররা কেন আপনাকে বেছে নেবে বলে আপনি মনে করেন?

তারেক এ আদেল: আমার বাবা (জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল) নব্বই-পূর্ববর্তী সময়ে সংসদ সদস্য ছিলেন। নব্বই পরবর্তী সময়ে দেশে মুখোশধারী গণতন্ত্র চলেছে। ইতিহাস বদলানো বা নষ্ট করার জন্য আমি এমপি হতে চাই না। আমার পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়গুলোই আমার আত্মবিশ্বাসের জায়গা।

ঢাকা মেইল: এর আগে দুবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করা হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার তুলনায় এবার নিশ্চয়ই ভালো অবস্থানে আছেন। সংসদ সদস্য হতে পারলে এই এলাকার জন্য আপনার অগ্রাধিকার কী হবে?

তারেক এ আদেল: সমাজকে ঠিক করাই হবে আমার প্রথম কাজ। আমি নির্বাচনে জয়ী হলে আমার বাসভবনে ঢাকা-৭ আসনের মানুষদের ডেকে তাদের আপ্যায়ন করাবো। পরে তাদের নির্দেশনা নেব। সমাজ ঠিক না হলে গ্যাস সংকট, চাঁদাবাজি, মাদক বা জলাবদ্ধতার সমাধান কোনো কিছুই সম্ভব নয়। মানুষ ঠিক হলে ছয় মাসেই ঢাকা-৭ বদলে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব। সমাজ পরিবর্তন সম্ভব না হলে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করে বের হয়ে আসবো।

Tareq2
নতুন রাজনীতির সূচনা করতে চান তরুণ এই রাজনীতিবিদ। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মেইল: আপনার দৃষ্টিতে এই এলাকার সবচেয়ে বড় ও জরুরি সমস্যা কী কী?

তারেক এ আদেল: আমার এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা সামাজিক বৈষম্য। আগে মানুষের মন ছিল, ধন ছিল না; এখন ধন আছে, মন নেই। এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই আমার মূল লক্ষ্য।

আরও পড়ুন

‘কিছু আসনে সমঝোতার চেয়ে রাজনৈতিক আদর্শটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছি’

ঢাকা মেইল: আপনি আপনার বাবার প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাহলে কি এটিকে আমরা আপনার বাবার আসন পুনরুদ্ধারের লড়াই হিসেবেও দেখতে পারি?

তারেক এ আদেল: বাবার আসন পুনরুদ্ধারের রাজনীতিতে আমি বিশ্বাসী না। সবারই অধিকার আছে। আমার সঙ্গে যারা এনসিপির নতুন ছেলেরা কাজ করছে, সংখ্যায় খুব কম। আমি চাই যে আমার এই নির্বাচনি অনুশীলনের মাধ্যমে, আমার মাধ্যমে এইখান থেকেও যাতে নেতা বের হয়ে আসে। তারা যাতে এই এলাকায় নেতৃত্ব দেয়। তারা যাতে ভবিষ্যতে সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

ঢাকা মেইল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

তারেক এ আদেল: ঢাকা মেইলকেও ধন্যবাদ।

বিইউ/এমআর/জেবি