images

আন্তর্জাতিক

ফরাসি ঔপনিবেশ জর্জরিত আফ্রিকার ইতিহাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

৩১ জানুয়ারি ২০২২, ১২:৩৫ পিএম

এক দেশ কর্তৃক অন্য এক দেশের উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নেয়াকে বলে ঔপনিবেশবাদ। ১৭০০ এবং ১৮০০-এর দশকে ইউরোপের ধনী, শক্তিশালী দেশগুলো (ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন এবং নেদারল্যান্ডস) আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া এবং ক্যারিবিয়ান মহাদেশে ঔপনিবেশ স্থাপন করে।

ঔপনিবেশিক শাসনে জর্জরিত হয়েছে গোটা বিশ্ব। দুইশত বছরের অধিক ঔপনবেশিক শাসনে শাসিত হওয়ার অভিজ্ঞা রয়েছে ভারতবর্ষেরও। অত্যাচারিত হয়েছে এ ভূখন্ডের মানুষ। ‍সম্পদ লুট করে পাচার করা হয়েছে ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড, পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

এরপর বিক্ষোভ, বিদ্রোহে ও অগণিত প্রাণের বিনিময়ে কাগজে কলমে বিদায় হয়েছে ঔপনিবেশবাদ। ১৯৪৫ থেকে ১৯৬০ এর মাঝে বর্বর এ ব্যবস্থার অবসান শুরু হয়। দেশে দেশে ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে মানুষ। ঐতিহাসিকভাবে এ সময়কে বলা হয় ‘বি-ঔপনিবেশায়ন’।

ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম ফ্রান্স। ১৬ থেকে ১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম ফরাসি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের গোড়পত্তন হয়। স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের পরে ফরাসি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যই ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাম্রাজ্য। আয়তন ছিল ১ কোটি ২৩ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার।

পশ্চিম আফ্রিকায় আফ্রিকার আটটি ফরাসি ঔপনিবেশিক অঞ্চল নিয়ে একটি ফেডারেশন ছিল। মৌরিতানিয়া, সেনেগাল, মালি, গিনি, আইভরি কোস্ট, বুরকিনা ফাসো, বেনিন এবং নাইজারের মত দেশ এই ফরাসি ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৯৫ সালে গঠিত এই ফেডারেশন ১৯৬০ সালে ঔপনিবেশিক শাসন মুক্ত হয়। মরোক্ক, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, টোগো, চাদ, গ্যাবন, ক্যামেরুন, মাদাগাস্কার, জিবুতিও ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন সহ্য করেছে।

বহু বছরের শাসন-শোষণের পর আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ ফরাসি ঔপনিবেশ মুক্ত হয়। বর্তমানেও ভারত মহাসাগরের দ্বীপ রিইউনিয়ন ফ্রান্সের ঔপনিবেশ অঞ্চল। দ্বীপটি মাদাগাস্কার দ্বীপের প্রায় ৫৫০ কিমি পূর্বে এবং মরিশাস দ্বীপের ১৭৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। বর্তমানেও ফরাসি ঔপনিবেশ বিদ্যমান আফ্রিকার এমন আরেকটি অঞ্চল মায়োট। এটি দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে ভারত মহাসাগরের উত্তর মোজাম্বিক চ্যানেলে, উত্তর-পশ্চিম মাদাগাস্কার এবং উত্তর-পূর্ব মোজাম্বিকের মধ্যে অবস্থিত।

আফ্রিকায় ঔপনিবেশ বিরাজ রাখতে গঠিত ফেডারশনের নাম ছিল ‘Afrique-Occidentale française’ (AOF)। ‘ফ্রেঞ্চ ওয়েস্ট আফ্রিকা’ নামেই যা বিশ্বে পরিচিত ছিল। ফরাসি পশ্চিম আফ্রিকার প্রতিটি ঔপনিবেশ সেনেগালের রাজধানী ডাকার থেকে একজন গভর্নর জেনারেলের দ্বারা পরিচালিত হত। প্যারিসের সংসদে নির্বাচিত ‘ঔপনিবেশ মন্ত্রী’র নির্দেশ পালন করতেন গভর্নর জেনারেল। এমনকি গভর্নর জেনারেল নিয়োগের এখতিয়ার শুধুমাত্র ঔপনিবেশ মন্ত্রীর অধীনেই ছিল।

 

ঔপনিবেশিক শাসনামলে বিভিন্ন অঞ্চলে হত্যা, অত্যাচার এমনকি গণহত্যাও চালিয়েছে ফ্রান্স। ঔপনিবেশ রুয়ান্ডায় ১৯৯৪ সালে ভয়াবহ গণহত্যা চালায় দেশটি। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে কমপক্ষে আট থেকে দশ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। রুয়ান্ডার কিগালিতে গণহত্যার স্মরণে নির্মিত সমাধিস্থলে গণহত্যায় নিহত ২৫০,০০০ মানুষকে কবর দেয়া হয়। এছাড়া আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে ৫৬ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ১৮৩০ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ১৩২ বছর ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছে আলজেরিয়াকে।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদও অবাধে উত্তোলনের সুযোগ পায় ফরাসি কোম্পানিগুলো। নিয়ন্ত্রণ করে অনেক দেশের মুদ্রানীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ। বিনিময়ে কিছুই জোটেনি আফ্রিকার ভাগ্যে। উপনিবেশগুলোতে জীবনমান, শিক্ষাহার পুরো বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে কম। এমনকি ফ্রান্স এখনও এসব দেশে ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত সরকারি ভবন ও স্থাপনার ভাড়া আদায় করে।

টিএম