images

আন্তর্জাতিক

ইউক্রেন যুদ্ধ: এক বছরে যেভাবে পাল্টে গেছে বিশ্ব রাজনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৯:৩৮ এএম

এক বছর আগে ঠিক আজকের এই দিনটিতে (২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২) গোটা বিশ্ব জেগে উঠতে শুরু করেছিল ইউরোপে আবার যুদ্ধ শুরু হয়েছে, এই খবর শুনে। কিয়েভে ভোরের আলো ফোটার আগেই আঘাত করছিল একের পর এক রুশ ক্ষেপণাস্ত্র, শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল হাজার হাজার মানুষ। এই যুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের ছায়া দেখছে বিশ্ব। গত এক বছরে যুদ্ধের চিত্র বদলেছে, ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে বিশ্ব রাজনীতিতেও।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য রাশিয়ার বিপক্ষে চলে গেছে কিনা- সেটা নিয়ে দু'ধরনের মতামত আছে বলে জানান মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমর বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী।

তিনি বলেন, 'একদিকে ন্যাটো বলছে, রাশিয়া প্রচণ্ড-ভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক- সমস্ত দিক থেকে। বৃহৎ সামরিক শক্তি হিসেবে রাশিয়ার যে একটা বিরাট ভাবমূর্তি ছিল, সেটা নষ্ট হয়েছে। তাদের সেনাবাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাজেই রাশিয়া দেখতে যতটা শক্তিধর মনে হয়, কার্যত তারা ততটা নয়।'

সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, ইউরোপের অনেক দেশ এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলে গেলেও বাকী বিশ্ব, বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলো কিন্তু সেরকম কট্টর কোন অবস্থান নেয়নি। কাজেই রাশিয়া এক ঘরে হয়ে গেছে এটা বলা যাবে না।

নব্বই এর দশকের শুরুতে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ধসে পড়লো, তখন কমিউনিজমের পতনকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় বলে ঘোষণা করেছিলেন অনেকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা 'দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি এন্ড দ্য লাস্ট ম্যান' বলে একটা বই লিখে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপে আবার এক রক্তাক্ত যুদ্ধে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ব্যবস্থা উলট-পালট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক সৈয়দ ইফতেখার আহমেদ বলেন, 'এই যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ধারণা ছিল, স্নায়ু যুদ্ধের অবসানের পর ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটবে, অর্থাৎ, ইউরোপে বোধহয় আর কোন যুদ্ধ ঘটবে না। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্ব জুড়ে উদার গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আধিপত্য কায়েম হবে। কিন্তু তাদের হিসেবে একটা বড় ভুল ছিল।'

তিনি বলেন, 'রাশিয়ার যে আবার পুনরুত্থান ঘটতে পারে, সেখানে যে একটি পশ্চিমা-বিরোধী রুশ জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিতে পারে, এই সমীকরণটা গোণায় ধরা হয়নি। প্রেসিডেন্ট পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া তার অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তিকে সংহত করার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আসলে এক বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে এখন যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রাধান্য, এটি বজায় থাকবে কিনা, সেটাই কিন্তু এখন পশ্চিমা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। সবকিছুই এখন নির্ভর করছে ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফলের ওপর।'

চীন রাশিয়ার পাশে দাঁড়ালে কী ঘটবে?
ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে গত কদিন ধরে যে খবরটি সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, তা হলো চীনের ভূমিকা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিন্কেন বলেছেন, তাদের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, যে, চীন রাশিয়াকে হয়তো সামরিক অস্ত্রশস্ত্র জোগান দিতে পারে।

সামরিক সরঞ্জামের অভাবে রাশিয়া এখন বেকায়দায় আছে। কাজেই চীন যদি সত্যি সত্যি রাশিয়াকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, তাহলে সেটিকে অনেক বিশ্লেষক একটা ‘গেম চেঞ্জার’ বলে বর্ণনা করছেন। চীন যদি এই কাজ করে, তাহলে কি পুরো পরিস্থিতি আমূল বদলে যেতে পারে?

এ প্রশ্নের উত্তরে সৈয়দ মাহমুদ আলী বলছেন, বহু দশক ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর একটা বড় দুশ্চিন্তা ছিল, রাশিয়া এবং চীন যদি তাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়, তখন কী হবে। ইউরেশিয়া- অর্থাৎ ইউরোপ এবং এশিয়া, দুই মহাদেশ জুড়ে যে বিশাল ভূখণ্ড, সেখানে যদি কোনদিন একটি দেশ, বা একাধিক দেশের মৈত্রী জোট যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটা বিরাট বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্যেই কিন্তু পশ্চিমা শক্তি রাশিয়াকে চীন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। তারা চীনকে একঘরে করে চীন বিরোধী সংগ্রামের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটা হয়নি। পশ্চিমা দেশগুলোকে এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া এখন চীনের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চীন রাশিয়াকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেবে কিনা বা কতদূর দেবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। সৈয়দ মাহমুদ আলী মনে করেন, 'চীন তাদের মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেবে। যদি চীন এবং রাশিয়া সত্যি একটি মৈত্রী জোটে পরিণত হয়, যখন নেটো কিনা ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে একটি প্রক্সি ওয়ার বা পরোক্ষ যুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন বিশ্ব রাজনীতিতে আমরা একটা বিরাট বিভাজন বা দ্বি-মেরুকরণ দেখবো। এর একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোট, অন্যদিকে চীন-রাশিয়া এবং তাদের সহযোগী দেশগুলো।'

সৈয়দ মাহমুদ আলী মনে করেন, এটি হবে বিশ্ব রাজনীতির জন্য খুবই বিপদজনক এক মোড়। এই দুই মেরুর দেশগুলোর মধ্যে যখন যুদ্ধ চলছে, যাদের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি পরমাণু শক্তিধর দেশ, এই পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের শক্তি, ক্ষমতা এমনকি ইচ্ছে পর্যন্ত যাদের আছে, সেখানে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।

সূত্র: বিবিসি

একে