বিশেষ প্রতিনিধি
০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১২ পিএম
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে তিনটি প্রধান দুর্নীতির মামলায় বিচার চলছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ আনা হয় এবং ২০২০ সাল থেকে তার বিচারকার্য শুরু হয়।
প্রথম মামলাটি করা হয় নেতানিয়াহু ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে (যেমন অ্যারন মিলচান ও জেমস প্যাকার) উপহার ও দামি উপহার নেওয়ার অভিযোগে। এর বিনিময়ে তিনি তাদের বিভিন্ন সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ। এই মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দ্বিতীয় মামলাটি করা হয়, ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র 'ইয়াদিওথ আহরোনোথ'-এর প্রকাশক আরন মোজেসের সঙ্গে নেতানিয়াহুর গোপন সমঝোতার অভিযোগে। প্রতিদ্বন্দ্বী সংবাদপত্র 'ইসরায়েল হায়োম'-এর প্রচার সীমিত করার বিনিময়ে নিজের পক্ষে অনুকূল সংবাদ প্রকাশের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এই মামলায়ও তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে।
তৃতীয়টি সবচেয়ে গুরুতর মামলা। টেলিযোগাযোগ কোম্পানি 'বেজেক'-এর মালিক শাওল ইলোভিচের সঙ্গে সম্পর্কিত এটি। যোগাযোগমন্ত্রী থাকা অবস্থায় নেতানিয়াহু ইলোভিচের কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রক সুবিধা দেন এবং এর বিনিময়ে ইলোভিচের নিয়ন্ত্রিত সংবাদ ওয়েবসাইট 'ওয়ালা' (Walla)-তে নিজের এবং তার স্ত্রীর পক্ষে ইতিবাচক প্রচার পান বলে অভিযোগ। এই মামলায় তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে, নেতানিয়াহু শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। বিচার চলাকালীন বিভিন্ন সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানিতে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত ও রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে তিনি আদালতে উপস্থিত হওয়া কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন।
ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ক্ষমা করতে পারেন কেবল তখনই যখন দোষী ব্যক্তি তার অপরাধ স্বীকার করেন, তবে নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমার আবেদনও করেছেন বা এ নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
এতদিন প্রধানমন্ত্রীত্বের দোহাই দিয়ে মামলা থেকে পার পেলেও এখন চিত্র ভিন্ন। নির্বাচনে হেরে নানা ফন্দি ফিকির করেও প্রধানমন্ত্রীর পদটি আর আঁকড়ে ধরে রাখতে পারলেন না। সব মিলিয়ে ঘরে-বাইরে সবখানেই প্রচণ্ড চাপে আছেন দখলদার দেশটির এই যুদ্ধবাজ নেতা।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে গেছেন ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ তাকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন।
আর এর মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা হলো ইসরায়েলে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় আইজেনকটকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রেসিডেন্ট। রোববার (৮ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিক এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার হাতে সরকার গঠনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে বলে প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র জানিয়েছেন।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নতুন সরকার গঠনের জন্য কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে চলতি সপ্তাহে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেন প্রেসিডেন্ট হারজগ।
আলোচনায় আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোসহ মোট ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানান মাত্র ৪৬ জন আইনপ্রণেতা।
সরকার গঠনের জন্য আইজেনকট ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো হতে পারে। ১২০ সদস্যের ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে অন্তত ৬১ জনের সমর্থন নিয়ে জোট সরকার গঠন করতে হবে তাকে। সরকার গঠনের জন্য এটিই ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৪৮টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ও কট্টর ইহুদি ধর্মীয় দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। ফলে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন পায়নি।
এবারের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে।
তবে আইজেনকট স্পষ্ট জানিয়েছেন, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠন করবেন না তিনি। তাদের সমর্থন নিয়ে জোট গঠন করলে তার পক্ষে ৬৭টি আসন পাওয়া সম্ভব হতো।
অন্যদিকে অতি-গোঁড়া ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাস পার্টির সমর্থন পেলে আইজেনকটের আসনসংখ্যা ঠিক ৬১-তে পৌঁছাবে।
এ ছাড়া পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে প্রয়োজনীয় সমর্থন পেলে ৬১ আসনের কম নিয়েও সরকার গঠন করা সম্ভব।
আল জাজিরার রামাল্লা প্রতিনিধি নূর ওদেহ বলেন, আইজেনকটকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল প্রত্যাশিত। কারণ, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় সরকার গঠনের পক্ষে সবচেয়ে বেশি আইনপ্রণেতার সমর্থন পেয়েছিলেন তিনিই।
নূর ওদেহ বলেন, এখন আইজেনকটের জন্য কঠিন কাজ শুরু হবে। তাকে এমন একটি সরকার গঠন করতে হবে, যা একদিকে নির্বাচনি প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে খুব বেশি আপস করবে না, অন্যদিকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের বিরোধিতা মোকাবিলা করে পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে টিকে থাকতে পারবে।
আইজেনকট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য একজনকে দায়িত্ব দেবেন। দ্বিতীয় মনোনীত ব্যক্তিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে তৃতীয় একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি শেষবারের মতো ১৪ দিন সময় পাবেন।
এরপরও সরকার গঠন সম্ভব না হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজন করা হবে। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নেতানিয়াহু।
কিন্তু নেতানিয়াহুকে সরাতে একজোট বিরোধীরা। আইজেনকট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ছিলেন।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা শুরুর পর প্রথম আট মাস নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় পর্যবেক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
শনিবার প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ তিবি বলেন, হারজগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিতই ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছিলাম, প্রেসিডেন্ট হয়তো জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের পথে এগোবেন।’ এ ক্ষেত্রে আইজেনকট ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি সম্ভাব্য চুক্তির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিবি বলেন, শেষ পর্যন্ত আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে সমর্থন জানানোয় তিনি যথেষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে গেছেন।
তিবির ধারণা, আইজেনকট আরব দলগুলোর বাইরের সমর্থন নিয়ে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারেন।
তিনি বলেন, এমন সরকার আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর কাছে ‘স্বপ্নের সরকার’ হবে না। তবে তাদের কাছে নেতানিয়াহু, ইতেমার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থনে বিরোধী জোট সরকার গঠন করলে ইসরাইলের পতন ঘটবে।
আগে থেকে ধারণকৃত এক ভিডিও বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘ইসলামপন্থিদের ওপর নির্ভরশীল এমন সরকার ভেতর থেকেই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলবে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে যা ঘটছে, তার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।’
ইউরোপের কিছু অংশে ইসলামি আইন চালু হয়ে গেছে—এমন মিথ্যা দাবি করে আসা উগ্র ডানপন্থি রাজনীতিকদের বক্তব্যের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এ বক্তব্যের মিল রয়েছে।
নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নির্বাচনের আগে থেকেই ক্ষীণ ছিল। এমনকি পালাক্রমে দুজনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থাও এখন প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
নির্বাচনি প্রচারণায় আইজেনকট কিছু বিষয়ে নমনীয় অবস্থানের সুযোগ রাখলেও নেতানিয়াহুর বিষয়ে তিনি ছিলেন অনড়। তার বক্তব্য ছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার সময় দেশের নিরাপত্তার চূড়ান্ত দায়িত্বে ছিলেন নেতানিয়াহু। তাই তার পক্ষে আর সরকারে থাকা উচিত নয়।
নির্বাচনের পর আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলে ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন নেতানিয়াহু। এতে তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের একতরফা ফলাফলও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিরোধী নেতারা।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের কাছে ইসরাইলের ভাবমূর্তি এখন এতটাই খারাপ এবং নেতানিয়াহু এতটাই অজনপ্রিয় যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী ছাড়া সেই সম্পর্ক মেরামত শুরু করাও সম্ভব নয়।
গত শুক্রবার আইজেনকট বলেন, ‘ইসরাইল ইতোমধ্যে একটি বিপজ্জনক কূটনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহু যদি ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখেন, তবে তা বিপজ্জনক। এ পরিস্থিতি আর এক দিনও চলতে দেওয়া উচিত নয়।’
আইজেনকটের হাতে শুরুতে রয়েছে পার্লামেন্টের ৪৮ জন সদস্যের সমর্থন। এর মধ্যে তার নিজের মধ্য-ডানপন্থি ইয়াশার পার্টির ২১টি আসন রয়েছে।
এ ছাড়া নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের মধ্যপন্থি টুগেদার পার্টির ১২টি, ইয়ার গোলানের বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির আটটি এবং আভিগদর লিবারম্যানের ডানপন্থি হলেও ধর্মনিরপেক্ষ দল ইসরাইল বেইতেনুর (ইসরাইল আওয়ার হোম) সাতটি আসন রয়েছে।
এ সংখ্যা নেতানিয়াহুর জোটের চেয়ে বেশি। অতি-গোঁড়া ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রী করার পক্ষে সুপারিশ না করায় তার পক্ষে এখন মাত্র ৪৬ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে।
তবে আরও বড় জোট, এমনকি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে আইজেনকটের সামনে দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করা, যাদের আসনসংখ্যা ১৩। অন্যটি হলো আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া, যারা এবার রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে।
তবে বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা, রাজনৈতিক কর্মী ও উপদেষ্টাদের মতে, উভয় পথেই বড় ধরনের জটিলতা রয়েছে। জোট গঠনের আলোচনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়েছেন।
নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে পার্লামেন্টের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
আরও পড়ুন:
আগামী মঙ্গলবার নতুন আইনপ্রণেতারা শপথ নেবেন। এরই মধ্যে বর্তমান স্পিকার ও নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আমির ওহানার পরিবর্তে নতুন স্পিকার নির্বাচনের ব্যবস্থা করছেন আইজেনকট।
তিনি সফল হলে পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কমিটির নিয়ন্ত্রণ তার মিত্রদের হাতে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুবিরোধী জোট নতুন আইন প্রণয়নের কাজও শুরু করতে পারবে। এতে নির্বাচনি প্রচারণায় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি কাজ করার সক্ষমতাও দেখাতে পারবেন আইজেনকট।
রাজনৈতিক মহলের ধারণা, শুরুতেই নেতানিয়াহুর জোটের করা বিতর্কিত আইনগুলো বাতিলের উদ্যোগ নিতে পারে বিরোধীরা।
এর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার মতো বিতর্কিত বিচারিক সংস্কার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় যেসব ব্যর্থতা ছিল, তা তদন্তে একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা। বিরোধী নেতাদের অন্যতম নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল এটি।
আরব দলগুলোর ১৯টি আসন আইজেনকটকে পার্লামেন্টে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিতে পারে। কিন্তু তাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করলে অন্য মিত্রদের হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
আপাতত এ প্রশ্নের কোনো সমাধান নেই। তিনটি ছোট আরব দলের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট জোট, যারা ১১টি আসন পেয়েছে, ইতোমধ্যে সরকারে যোগ না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে সংখ্যালঘু সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পারে তারা।
অন্যদিকে আটটি আসন পাওয়া ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা'আম এখনো সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
তবে আইজেনকট শর্ত দিয়েছেন, তার সরকারে যোগ দিতে হলে প্রত্যেক দলকে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
রা'আমের নেতা মনসুর আব্বাস এ শর্ত মানতে রাজি হননি। যদিও তিনি সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তবে বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, হামাসসহ সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ হওয়া উচিত।
মনসুর আব্বাস আইজেনকটের শর্ত মেনে নিলেও জোট গঠনের পথে আরেকটি বড় বাধা আভিগদর লিবারম্যান। ইসরাইল বেইতেনু পার্টির এ নেতা বারবার বলেছেন, আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠন করা কিংবা তাদের বাইরের সমর্থন নেওয়া—কোনোটিতেই তিনি রাজি নন।
ফলে আইজেনকটের সামনে এখন অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার পথই বেশি খোলা রয়েছে।
এদিকে, নির্বাচনের পর থেকেই নেতানিয়াহু ও বিদায়ী জোট সরকারের অন্য নেতারা অভিযোগ করে আসছেন, আরব দলগুলো নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করেছে।
তাদের অভিযোগ, ভোটারদের ঘুষ দেওয়া, ভয়ভীতি দেখানো, জালিয়াতি এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে নেওয়া হয়েছে।
লিকুদ পার্টির আইনজীবী ইলান বোমবাখ দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেন, নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা লিকুদের পর্যবেক্ষকরা প্রায় ৭০০টি অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এসব অভিযোগে বলা হয়েছে, আরব দলগুলোর কর্মীরা স্মার্টফোন অ্যাপ ব্যবহার করে ভোটারদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন।
তার দাবি, প্রতিটি অভিযোগের সঙ্গে শত শত থেকে হাজার হাজার ভোটের বিষয় জড়িত।
বোমবাখের অভিযোগ, নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে দেশটির হাইকোর্ট এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। কিন্তু আরব দলগুলো সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রযুক্তি ব্যবহার করায় তারা অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে।
তবে নির্বাচনের পুরো ফল চ্যালেঞ্জ করা হবে, নাকি শুধু নির্দিষ্ট কিছু আসন বা ফলাফল নিয়ে আপিল করা হবে—সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
জেরুজালেম জেলা আদালতে এ আপিল করা হবে। তবে ১৭ নভেম্বরের আগে তা দাখিল হওয়ার সম্ভাবনা কম। নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করার জন্য ওই দিনই শেষ সময়।
এদিকে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসেবী পর্যবেক্ষক পাঠানো সংগঠন ‘সিভিলিয়ান ইলেকশন গার্ড’ জানিয়েছে, ভোটারদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণে অ্যাপ ব্যবহারের ৩৭৪টি সম্ভাব্য অনিয়ম তারা শনাক্ত করেছে।
তবে সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের অনিয়মে সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল লিকুদ পার্টির কর্মী ও ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। মোট ঘটনার ৩২ শতাংশের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
এ তালিকায় রয়েছে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমি ১০ শতাংশ, শাস পার্টি ৬ শতাংশ, রা'আম ২ শতাংশ এবং জয়েন্ট লিস্ট ১ শতাংশ।
নির্বাচনের ১০ দিন আগে হাইকোর্ট এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিলে লিকুদ পার্টির মন্ত্রীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।
বিশেষ করে লিকুদ ও কট্টর অর্থোডক্স দলগুলো গত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করেছে। দলগুলোর দাবি ছিল, এ পদ্ধতি বন্ধ করা হলে নির্বাচনের দিন তাদের ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
তবে, এখন দেখার বিষয়- ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠনের পর নেতানিয়াহুর দুর্নীতির মামলাগুলো আবারও আলোর মুখ দেখে কি-না। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত কারাগারে তিনি কারাগারে যান কি-না। সময়ই এসব প্রশ্নের উত্তর বলে দেবে।
-এমএমএস