আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১২ এএম
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজার উত্তরাঞ্চলের আল-মিনা শরণার্থী শিবিরে নিজের তাঁবুর প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আছেন ২৯ বছর বয়সী রানা আদনান হমেইদা। কোলে দুই মাস বয়সী শিশুকন্যা। রাতভর বৃষ্টির পানিতে তাঁবু ডুবে যাওয়ায় শিশুটিকে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। পরিবারের বিছানাপত্র, কম্বল ও কাপড়চোপড়-সবই ভিজে গেছে। গাজার সর্বশেষ ঝড়ের মধ্যে ঠাণ্ডা ও বাতাসে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাঁর সন্তানদের।
প্রচণ্ড বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় শিবিরজুড়ে দুর্যোগ নেমে আসার পর মধ্যরাত থেকেই স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন হমেইদা। তাঁবুর ভেতরে পানি ঢুকে ভিজিয়ে দিয়েছে পরিবারের সব জিনিসপত্র। কাপড়চোপড় ভিজে যাওয়ায় সেগুলো শুকানোর জন্য প্রতিবেশীদের সহায়তা নিতে হয়েছে তাঁকে।
আল-জাজিরাকে হমেইদা বলেন, ‘মধ্যরাত থেকে আমরা জেগে বসে আছি। তাঁবুর ভেতরে পানি ঢুকে বিছানাপত্র, কম্বল-সবকিছু ভিজে গেছে। সকালে দেখি, আমার ছেলে ও ছোট মেয়েটি ঠান্ডায় কাঁপছে। দুই মাসের শিশুটিও প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমি কী করব? সন্তানদের আগলে রাখব, নাকি পানি ঠেকানোর চেষ্টা করব? ছোট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে তাকে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পানি ঢোকা বন্ধ হচ্ছিল না। বাতাস এতটাই প্রবল ছিল যে মনে হচ্ছিল, তাঁবুটি বুঝি মাটি থেকে উপড়ে নিয়ে যাবে।’
হমেইদার স্বামী ৩০ বছর বয়সী সামেহ হমেইদা বলেন, সমুদ্রের খুব কাছাকাছি হওয়ায় তাঁদের তাঁবুটি ঝড়ের সরাসরি কবলে পড়েছে। তাঁবুতে কোনো ত্রিপল বা তাপ নিরোধক উপকরণ নেই, যা এমন দুর্যোগে পরিবারটিকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারত।
গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও শহর প্লাবিত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া বহু ফিলিস্তিনির জন্য এটি চতুর্থ শীতকাল।
শনিবারের বৃষ্টিতে গাজার কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে পানির উচ্চতা ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার (১২ থেকে ১৬ ইঞ্চি) পর্যন্ত বেড়েছে। এ ঘটনায় গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা শত শত সহায়তার ফোন পেয়েছে।
আল-মিনা শরণার্থী শিবিরের অনেক তাঁবুতে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়েছে। প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি পরিবারের বসবাস এই শিবিরে। পানিতে শিবিরের মাটি পরিণত হয়েছে কাদাপানির জলাশয়ে।
৪০ বছর বয়সী রায়েদ আবু আমশা বলেন, ঝড়ের সময় তাঁর পরিবারের ওপর তাঁবুটি ভেঙে পড়ে। নিজের সন্তানদের পাশাপাশি প্রয়াত ভাইয়ের চার সন্তানসহ মোট নয় শিশুর দায়িত্ব তাঁর ওপর। ঝড়ে সবার কাপড় ও কম্বল ভিজে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘নিজের সন্তানদের পাশাপাশি এতিম শিশুদেরও দেখাশোনার দায়িত্ব আমার। কিন্তু তাদের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য আমার নেই। মাত্র দুই ঘণ্টার ঝড় আমাদের কী অবস্থায় ফেলেছে, দেখুন। আমাদের তাঁবু, ত্রিপল এবং শিশুদের সুরক্ষার জন্য যেকোনো ধরনের উপকরণ প্রয়োজন। এভাবে আর কত দিন আমাদের বেঁচে থাকতে হবে?’
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনেও ধসের শঙ্কা
মধ্য গাজার কয়েক দশক পুরোনো নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে স্থায়ী ভবনগুলোতেও বৃষ্টির কারণে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৫৪ বছর বয়সী নাসের আল-হাজ্জ থাকেন একটি বহুতল ভবনে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওপরের তলাগুলো থেকে ধ্বংসাবশেষ তাঁর বাসার ওপর পড়ে। এতে ছাদে বড় একটি গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই সেই গর্ত দিয়ে ঘরে পানি ঢোকে।
ছাদটি ঠেকা দিয়ে মজবুতের চেষ্টা করা হলেও ভবনটি বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে আল-হাজ্জকে সতর্ক করেছেন একজন প্রকৌশলী। গাজায় আবারও প্রতিকূল আবহাওয়া দেখা দিলে ভবনটির আরও ধ্বংসাবশেষ ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সর্বশেষ ঝড়ের সময় আল-হাজ্জ সন্তানদের নিয়ে এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। ছাদ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়া বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। তাঁর দুই সন্তান অটিজমে আক্রান্ত। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে দূরে ভবনটির নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষে ঘুমায় তারা।
আল-জাজিরাকে আল-হাজ্জ বলেন, ‘আমি এমন একটি জায়গায় থাকতে বাধ্য হচ্ছি, যেটি যেকোনো মুহূর্তে আমাদের মাথার ওপর ধসে পড়তে পারে। কিন্তু যাব কোথায়? বাড়িভাড়া অনেক বেশি। তাঁবুও তো নিরাপদ নয়। জানি, জায়গাটি কতটা বিপজ্জনক। কিন্তু আমার আর কোনো উপায় নেই।’
বন্যার ঝুঁকিতে বাস্তুচ্যুত ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দফতর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গাজায় বাস্তুচ্যুত প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। নিচু এলাকা ও উপকূলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি স্থানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় বসবাস করছেন ৪ লাখের বেশি মানুষ।
এ ছাড়া প্রায় ৪৪ হাজার ফিলিস্তিনি কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছেন। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাজাজুড়ে ৪ হাজারের বেশি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শীতের আগে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৫০টি পরিবারের আশ্রয় সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে যে পরিমাণ সহায়তা উপকরণ রয়েছে, তা দিয়ে চাহিদার মাত্র ১৮ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব।
ঝড় মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে গাজা পৌর কর্তৃপক্ষও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৫ কিলোমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালা এবং ২১২ কিলোমিটার পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক। আটটি পানি নিষ্কাশন পাম্প স্টেশন এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহের তিনটি প্রধান জলাধারও অচল হয়ে পড়েছে।
গাজা পৌরসভার মুখপাত্র হোসনি মুহান্না জানান, সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বর্তমানে সচল নিষ্কাশনব্যবস্থা দিয়ে মোট বৃষ্টির পানির সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অপসারণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে আমরা পানি নিষ্কাশনের নালাগুলো পরিষ্কার করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
পৌর কর্তৃপক্ষের কর্মীরা নালা ও ম্যানহোল পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ, পানিপ্রবাহের পথ সচল রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত নিষ্কাশন লাইন মেরামত এবং পানির পাম্প চালু রাখার কাজ করছেন। তবে জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটের কারণে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে নিষ্কাশনব্যবস্থার সক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে সতর্ক করেছেন মুহান্না।

তিনি জানান, শুধু গাজা সিটিতেই ২ হাজারের বেশি ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শহরটিতে ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ ২ কোটি ৫০ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনাকারী কমিটিগুলোও আশ্রয় উপকরণের সংকটে পড়েছে। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের জরুরি কমিটির কর্মকর্তা আদলি আওয়াদ বলেন, বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁবু ও ত্রিপল বিতরণের চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা মজুত উপকরণের তুলনায় অনেক বেশি।
আওয়াদ বলেন, ‘আমরা যত বেশি সম্ভব তাঁবু ও ত্রিপল দেওয়ার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি তাঁবুর চারপাশে পানি সরিয়ে নেওয়ার নালা খননেও পরিবারগুলোকে সহায়তা করছি, যাতে বৃষ্টির পানি তাঁবুতে ঢুকতে না পারে এবং জলাবদ্ধতা কমানো যায়।’ সূত্র: আল জাজিরা।
এমআর