Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

আল-সাইয়েদ, এক অনুপ্রেরণার নাম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২১ পিএম

সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আবদুল আল-সাইয়েদ যেন একটি মিনিটও নষ্ট করতে রাজি নন। 

তিনি এখন সর্বত্র। এমএস নাউয়ের বিখ্যাত ‘মর্নিং জো’, সিএনএন, এবিসিসহ আমেরিকার প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিয়ে যাচ্ছেন। আর প্রতিটি সাক্ষাৎকার থেকেই শেখার মতো অনেক কিছু আছে।

তিনি অত্যন্ত মনোযোগী, স্পষ্টভাষী, বাগ্মী, ক্ষুরধার এবং অসাধারণ আত্মবিশ্বাসী। কোনো অপ্রাসঙ্গিক কথায় মনোযোগ না হারিয়ে প্রতিবারই নিজের মূল বক্তব্য তুলে ধরছেন।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমেরিকার যেসব প্রভাবশালী গণমাধ্যম বছরের পর বছর মুসলমানদের ভিন্ন চোখে দেখে এসেছে, এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন মুসলমানরা এই সমাজের বাইরের কেউ, তারাই এখন আল-সাইয়েদকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। 

আজ ‘হাবিবি’, ‘ইনশাআল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দগুলো কোটি কোটি আমেরিকানের কাছে আর অচেনা ঠেকছে না। 

সাক্ষাৎকার নেওয়ার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, আল-সাইয়েদ যেন বহুদিন ধরেই তাদের আপনজন! মাত্র দুদিন আগেও সিএনএনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বৈরী। অথচ এখন তাদের আচরণ একেবারেই ভিন্ন।

আবদুল আল-সাইয়েদের সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো, গণমাধ্যমের এই গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য তিনি নিজের বক্তব্য বা অবস্থান একটুও পরিবর্তন করেননি। 

আগের মতোই নির্ভয়ে কথা বলছেন তার মুসলিম পরিচয়, ধর্মবিশ্বাস, জাতিগত পরিচয়, গায়ের রং, গাজা, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং বৈশ্বিক অবিচার নিয়ে।

তিনি পরিষ্কার করে বলছেন, ইহুদি ধর্মবিশ্বাস আর জায়নবাদ এক বিষয় নয়! ইহুদি, মুসলিম, এমনকি ধর্মে অবিশ্বাসী মানুষের সন্তানদের নিরাপত্তাও তার কাছে নিজের সন্তানের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনের আগে তিনি যা বলেছেন, নির্বাচনের পরও ঠিক তা-ই বলে যাচ্ছেন। প্রতিটি সাক্ষাৎকারে একই সত্য, একই দৃঢ়তা, একই সাহস। ক্ষমতাবানদের সামনে সত্য উচ্চারণ করতে তিনি বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করেন না।

এক বিলিয়নেরও বেশি মুসলমানের বিশ্বাস, অনুভূতি ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা আমেরিকার মূলধারার গণমাধ্যমে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি।

সেই বাস্তবতাকে আমেরিকার রাজনীতি ও গণমাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে তুলে ধরার মতো একজন মানুষকে আমরা দেখতে পাচ্ছি! তিনি হলেন আবদুল এল-সায়েদ।

উত্তর আমেরিকার মুসলমানদের কাছে এই সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা দেখছি, একজন মুসলিম রাজনৈতিক নেতাকে আমেরিকার প্রধান গণমাধ্যমগুলো শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও গুরুত্ব দিচ্ছে। তার কথা শুনছে, তার মতামতকে আলোচনায় আনছে। এটি আমাদের জন্য অনেক বড় একটি পরিবর্তনের অনুভূতি।

ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্স তাকে ‘শয়তান’ আখ্যা দিয়েছেন। নানা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। কিন্তু এল-সায়েদ  একটুও পিছিয়ে যাননি। বরং তিনি পালটা জবাব দিয়েছেন, অপমানের প্রতিবাদ করেছেন এবং দেখিয়ে দিয়েছেন, বুলিদের ভয়ে চুপ থাকার দিন শেষ।

ট্রাম্পকে প্রকাশ্যেই ‘ইডিয়ট’ ও ‘সবচেয়ে নির্বোধ ব্যক্তি’ বলেছেন। জেডি ভ্যান্সকে বলেছেন ‘বিবেকহীন’।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যা খুব কমই কল্পনা করতে পেরেছি, তিনি তা-ই করে দেখাচ্ছেন। একজন মুসলিম রাজনীতিবিদ আমেরিকার ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের চোখে চোখ রেখে সমান দৃঢ়তায় কথা বলছেন।

আমার বিশ্বাস, আগামী দিনগুলোতে এল-সায়েদ আমেরিকার রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী হয়ে উঠবেন। জেডি ভ্যান্সের ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। জেডিকে তিনি ছেড়ে দেবেন না।

প্রতিবারই তার কথার জবাব দেবেন নিজের বক্তব্য দিয়ে। জানুয়ারিতে শপথ নেওয়ার পর আমরা হয়তো আরও দেখব, এল-সায়েদের পালটা  আঘাত কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হবে। নির্ভীক আল-সাইয়েদ যে অন্যায় ও আক্রমণের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার থাকবেন, তা তার সাম্প্রতিক অবস্থান থেকেই স্পষ্ট।

উত্তর আমেরিকায় বেড়ে ওঠা মুসলিম শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা। একটি পুরো প্রজন্মের জন্য তিনি আশার প্রতীক।

যেসব শিশু-কিশোর কখনো কখনো নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় ভোগে, এল-সায়েদ  তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছেন। 

তিনি দেখাচ্ছেন, সফল হওয়ার জন্য নিজের ধর্মবিশ্বাস, পরিচয় কিংবা আদর্শ লুকানোর কোনো প্রয়োজন নেই। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়, নিজের বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলা যায়, বড় স্বপ্ন দেখা যায়, এমনকি নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়েও পৌঁছানো যায়।

হয়তো আল-সাইয়েদের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে শুধু রাজনৈতিক লড়াইয়ে জয়ী হওয়া নয়, বরং তার মাধ্যমে একটি পুরো প্রজন্মের জন্য নতুন দরজা খুলে দেওয়া এবং নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস জোগানো।

এই কারণেই এল-সায়েদের এই উত্থান আমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করব, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আবদুলের কাছ থেকে শিক্ষা নেবে এবং দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

-এমএমএস