Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

হোয়াইট হাউসের নতুন ‘চিফ অব স্টাফ’ কে এই স্টিফেন মিলার?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ এএম

দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার তাকে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হবেন মিলার। এমন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প তার সবচেয়ে বিতর্কিত নীতিগুলোর প্রতি আরও বেশি অনড় অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। আগামী জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। ধারণা করা হচ্ছে, হোয়াইট হাউসে স্টিফেন মিলারের ভূমিকা নিয়ে তারা ব্যাপক তদন্ত শুরু করবে।

৪১ বছর বয়সী মিলার ট্রাম্পের অন্যতম সোচ্চার সমর্থক। প্রেসিডেন্টের ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী অভিযান এবং অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের নীতির অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাকে ধরা হয়।

নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প মিলারকে ‘আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের একজন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সোমবার থেকে সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন মিলার।

রাজনীতিতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগেই পরিচিতি

ট্রাম্পের বলয়ে প্রবেশের অনেক আগেই রক্ষণশীল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন স্টিফেন মিলার। সান্তা মনিকা হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি স্থানীয় বেতার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে স্কুলের উদারপন্থী নীতির বিরুদ্ধে সরব হতেন। এসব নীতিকে তিনি নিজের ভাষায় ‘লিবারেল’ বা উদারপন্থী নীতি হিসেবে বর্ণনা করতেন।

ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিউক কনজারভেটিভ ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন। এ সময় ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাক্রস দলের তিন খেলোয়াড়ের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।

স্নাতক শেষ করে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে চলে যান। সেখানে রিপাবলিকান দলের কংগ্রেস সদস্যদের আইনপ্রণয়নবিষয়ক সহকারী হিসেবে কাজ করেন। পরে রিপাবলিকান সিনেটর জেফ সেশন্সের সঙ্গেও কাজ করেন।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচার শিবিরে যোগ দেন মিলার। ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারের ভাষা তৈরিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়।

২০১৭ সালে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন বলেন, ‘আমার মনে হয়, শুরু থেকেই ট্রাম্প ও মিলরের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া ছিল। ট্রাম্পকে নিজের বক্তব্যের ধরন খুঁজে পেতে তিনি সাহায্য করেছিলেন।’

২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত বিজয়ের পর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ও বক্তৃতা লেখকের দায়িত্ব পান মিলার।

বিশেষ করে অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম্পের কঠোরতম পদক্ষেপগুলো প্রণয়নে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন। এসব পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে তিনি প্রায়ই পশ্চিমা ‘সভ্যতা’ রক্ষার বিষয়টি সামনে আনতেন।

ওই সময় ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেন, মিলার শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী বক্তব্য ও মতাদর্শকে উৎসাহিত করছেন।

trump ciief of staff-2২০১৯ সালে সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টার (এসপিএলসি) কিছু ইমেইল প্রকাশ করে। এসব ইমেইলে ট্রাম্পের এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ওয়েবসাইট ও মতাদর্শের প্রতি সমর্থনের অভিযোগ আনা হয়। এর পরপরই ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতারা হোয়াইট হাউস থেকে মিলারকে অপসারণের দাবি আরও জোরালো করেন।

২০২০ সালে কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন জেনেশুনে একজন পরিচিত শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিকে সরকারি নীতি নির্ধারণে ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী পদে রাখবে-এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে ২০১৮ সালে বিচার বিভাগের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রণয়নের পেছনেও মিলারের ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। এ নীতির আওতায় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ককে গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ব্যাপক হারে পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটে। অপরাধমূলক আটককেন্দ্রে শিশুদের তাদের মা-বাবার সঙ্গে রাখার সুযোগ না থাকায় অনেক শিশুকে মা-বাবার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। ব্যাপক জনরোষের মুখে পরে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ট্রাম্প এ নীতি পরিবর্তন করেন।

ট্রাম্পের উপদেষ্টা হিসেবে মিলার ‘ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস’ (ডাকা বা ডিএসিএ) কর্মসূচি বন্ধের জন্যও প্রচার চালান। এ কর্মসূচির আওতায় শৈশবে কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে আসা ব্যক্তিরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য বৈধ কাগজপত্র পাওয়ার সুযোগ পেতেন। ২০২১ সালে কর্মসূচিটিতে নতুন আবেদন গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রেও মিলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর মধ্যে ২০১৭ সালে কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল, যা পরবর্তী সময়ে ‘মুসলিম ট্রাভেল ব্যান’ নামে পরিচিতি পায়।

প্রাথমিক ওই আদেশে সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে সংশোধিত এই নীতির একটি সংস্করণকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বৈধতা দেন।

এ ছাড়া ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ট্রাম্পকে পরাজিত করা হয়েছে-এমন ভিত্তিহীন দাবিরও জোরালো সমর্থক ছিলেন মিলার। নির্বাচনে ট্রাম্পকেই বিজয়ী ঘোষণা করার একটি পরিকল্পনাতেও তিনি সমর্থন দেন।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যখন আবার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনো তার পাশেই ছিলেন মিলার।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর মিলারকে নীতিবিষয়ক উপপ্রধান কর্মকর্তা (ডেপুটি চিফ অব স্টাফ) এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এরপর থেকে ট্রাম্পের ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তিনি। এ অভিযানে দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। ক্রমেই এমন ব্যক্তিদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই অথবা যাদের বিরুদ্ধে ছোটখাটো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের মে মাসে ফক্স নিউজকে মিলার বলেছিলেন, ‘আমরা প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার অভিবাসীকে গ্রেফতারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিদিন এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে যাবেন।’

অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান সহিংস কর্মকাণ্ডের পক্ষেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। মিনিয়াপোলিসে জানুয়ারিতে পরিচালিত এক অভিযানে রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রথমে তিনি তাদের দুজনকেই ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। পরে প্রেটির বিষয়ে নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের বহিষ্কার অভিযানের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থনকারী এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকারী ভিসাধারী ও স্থায়ী বাসিন্দাদেরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, এ ধরনের মতামত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য ক্ষতিকর। এই অবস্থান তৈরিতে মিলারের ভূমিকা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাপক সমালোচনা ও তদন্তের মুখে পড়েছে।

জুলাই মাসে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক স্নাতক শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিল ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় মিলারের নামও রয়েছে। খলিলের অভিযোগ, তাকে এবং অন্য ফিলিস্তিনি নাগরিকদের আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে কর্মকর্তারা ষড়যন্ত্র করেছেন।

ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে ভূমিকার কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে খলিল এখনো বহিষ্কারের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি।

এর আগে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা ব্যক্তিদেরও সমালোচনা করেছেন মিলার। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রাশিদা তালিব, যিনি কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নারী হিসেবে পরিচিত।

হোয়াইট হাউসে ফিরে মিলার যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার বা ‘বার্থরাইট সিটিজেনশিপ’ বাতিলের উদ্যোগ নেন। তবে সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে ক্রমেই বেশি সোচ্চার হয়ে ওঠেন তিনি।

ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে সমর্থন করেন মিলার। জানুয়ারিতে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সামরিক শক্তির ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ড দখলের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করি, যেখানে আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার বা এ ধরনের বিষয় নিয়ে আপনি যত খুশি কথা বলতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবী পরিচালিত হয় শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার ভিত্তিতে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সময়ের শুরু থেকেই পৃথিবীতে এই কঠোর বাস্তবতাগুলো বিদ্যমান।’ সূত্র: আল জাজিরা।

এমআর