Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

মধ্যবর্তী ভোটে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ট্রাম্প, কী বলছে সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১১ পিএম

আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে শেষ মুহূর্তে মরিয়া প্রচার চালাচ্ছেন ট্রাম্প ও তার দলের নেতারা।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও শাসনকার্যের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত এই ভোটে ক্ষমতাসীন দলের আসন হারানোর প্রবণতা দীর্ঘদিনের। ফলে এবারও ঐতিহাসিক সেই নির্বাচনী সমীকরণ ট্রাম্পের দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাস কি ট্রাম্পের বিপক্ষে?

 

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাস রিপাবলিকানদের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ১৯৪৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ১৮টিতেই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে। 

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০১০ সালের নির্বাচন। সে সময় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৬৪টি আসন হারিয়েছিল। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের দল হারিয়েছিল ৫৪টি আসন। আবার ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা ৪২টি আসন হারিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে তুলে দেয়।

এই ইতিহাস বলছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করলেই পরবর্তী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জন্য রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা সহজ হয় না। বরং দুই বছরের শাসনামলে অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোসের জনমত জরিপেও রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। 

গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন ছিল ৩২ শতাংশ। এর আগের সপ্তাহে তার জনপ্রিয়তা নেমে এসেছিল ৩১ শতাংশে, যা তার দ্বিতীয় মেয়াদে সর্বনিম্ন পর্যায়।

একই জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, আজ নির্বাচন হলে তারা কোন দলকে ভোট দেবেন। জবাবে ৪৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের এবং ৩৬ শতাংশ রিপাবলিকানদের পক্ষে মত দেন। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান ছিল ১১ শতাংশ পয়েন্ট।

তবে এই জরিপকে সরাসরি নির্বাচনের ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই, চূড়ান্ত ফলাফলের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। 

জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান যুদ্ধ বড় ইস্যু

এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে সাধারণ মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ছে।

রয়টার্সের প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, ৭৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে তাদের আয়ের তুলনায় পণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। রিপাবলিকান ভোটারদের একটি অংশও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এবারের নির্বাচনে পররাষ্ট্রনীতিও অর্থনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং তেলের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব এখন ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনেও অনুভূত হচ্ছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে পররাষ্ট্রনীতি প্রধান ইস্যু হয় না। কিন্তু ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাবে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার পররাষ্ট্রনীতি নিজেই অর্থনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য বাড়তি রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই এবার ট্রাম্পের দলের প্রধান লক্ষ্য। ৪৩৫টি আসনের মধ্যে বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন রয়েছে। এর বাইরে একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন, যিনি নিয়মিত রিপাবলিকানদের পক্ষেই ভোট দিয়ে থাকেন।

প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে এবার সবকটি (৪৩৫টি) আসনেই নতুন করে নির্বাচন হচ্ছে। তবে অধিকাংশ আসনেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা নেই। কারণ সেসব আসনে যেকোনো নির্দিষ্ট দলের ভিত্তি এতটাই শক্ত যে বিজয়ী কে হবেন, তা প্রায় নিশ্চিত।

নির্বাচনী প্রচার ও ভোটের হিসাব-নিকাশ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা দ্য কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণ বলছে, মাত্র ১৮টি আসনে মূল দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা বা টস-আপ হতে পারে; যার ফল যে কোনো দিকে যেতে পারে।

এই ১৮টি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের মধ্যে ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকান এবং ৪টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এই ১৮টি আসনের একটিতেও জয় না পায়, তাহলেও তারা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে; যদি কেবল নিজেদের অনুকূলে থাকা বা কিছুটা এগিয়ে থাকা ৩৬টি আসন তারা ধরে রাখতে পারে।

অন্যদিকে উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা শক্ত। ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকানদের রয়েছে ৫৩টি আসন, আর ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি। বাকি দুটি আসনে স্বাধীন সদস্যরা থাকলেও তারা ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেন।

সিনেটররা ছয় বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন। ফলে প্রতি দুই বছর পর পর সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকালকের এই নির্বাচনে ৩৫টি সিনেট আসনে ভোট হচ্ছে। 

কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের তথ্য বলছে, এর মধ্যে মাত্র ৭টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই ৭টি সমমুখী আসনের ৬টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং ১টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। 

সোমাবার (২ নভেম্বর) রয়টার্সে প্রকাশিত নির্বাচনী বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা আশাবাদী অবস্থানে রয়েছে। তবে সিনেটের লড়াই অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ওহাইও, আইওয়া, আলাস্কা, টেক্সাস, কানসাস, মিশিগান ও মেইনের মতো অঙ্গরাজ্যের ফলাফল সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভোটার উপস্থিতি হতে পারে নির্ধারক

নির্বাচনে জনমতের পাশাপাশি ভোটার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জরিপে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটারদের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে ডেমোক্র্যাটদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে, রিপাবলিকান নেতারা আশা করছেন, ট্রাম্পের সমর্থকরা নির্বাচনের দিন বিপুলসংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হবেন। দলটির প্রচারশিবিরের ধারণা, শেষ মুহূর্তের প্রচার ও ট্রাম্পের সরাসরি অংশগ্রহণ রিপাবলিকান ভোটারদের উজ্জীবিত করতে পারে।

এবার রিপাবলিকানদের আরেকটি সুবিধা হলো নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয়।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দলীয় কমিটি ও সমর্থক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রচারে রিপাবলিকানরা কয়েক শ কোটি ডলারের ব্যবধান নয়, বরং কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থনে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠন ম্যাগা ইনকরপোরেটেডও বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। তবে প্রচারে অর্থের আধিক্য ভোটারদের অসন্তোষ কাটাতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে কী হবে ট্রাম্পের?

নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন প্রণয়ন কঠিন হয়ে পড়বে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবে। অভিবাসননীতি, ইরান যুদ্ধ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারি ব্যয় নিয়ে কংগ্রেসে জবাবদিহির চাপও বাড়তে পারে।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা ও ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে হবে প্রশাসনকে।

তবে কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের সব নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা থেকে যায়। ফলে নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সীমিত করতে পারলেও তার প্রশাসনের সব সিদ্ধান্ত বন্ধ করে দিতে পারবে না।

সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা, বিবিসি


এমএইচআর