আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম
দিল্লির রামলীলা ময়দানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া ব্লকের রোববারের সমাবেশ একদিকে যেমন ছিল বিজেপি-বিরোধী শিবিরের ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ, অন্যদিকে শরিক দলগুলোর কাছে নিজস্ব রাজনৈতিক সমীকরণ সাজানোর একটা সুযোগ বলে অনেকে মনে করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই বিষয়ে একমত যে এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক বিরোধী দলগুলোকে ফের এক মঞ্চে আসার সুযোগ করে দিয়েছে।
আম আদমি পার্টি বাদে প্রায় সব বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারাই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন রামলীলা ময়দানের সমাবেশে। ছিলেন সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়্গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স ফারুক আবদুল্লাহ-সহ অন্যরা।
কিন্তু এই মঞ্চে বিশেষ নজর ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারানোর পর জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে তার এই সক্রিয়তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
রোববারের সমাবেশ থেকে বিজেপিকে বাংলা থেকে সরানোর ডাক দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘আমরা হারিনি, জোর করে হারানো হয়েছে। বিজেপি বাংলাকে লুট করেছে। এদের ক্ষমতা থেকে সরাতেই হবে।’
রাজধানী থেকে তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে একদিকে যেমন বিজেপি-বিরোধী মঞ্চকে আরো ঐক্যবদ্ধ করতে সচেষ্ট তিনি, তেমনই পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী পরাজয়ের প্রশ্নকে জাতীয় বিরোধী রাজনীতির মঞ্চে তুলে ধরতেও সমানভাবে মরিয়া।
প্রসঙ্গত, রোববারের সমাবেশে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পূর্ণ সমর্থন থাকলেও কেউ উপস্থিত থাকবেন না তা আগেই জানিয়েছিলেন। তার আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অনেকে মনে করছেন, এটা নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না।
দিল্লি-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরথের কথায়, ‘বিরোধী নেত্রী হিসাবে মমতা নিজেকে বহু আগেই প্রমাণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকাকালীনও জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-নেত্রীর সঙ্গে নিজের সমীকরণ পৃথকভাবে বজায় রেখে এসেছেন। আবার বিভিন্ন সময়ে দুই দলের মধ্যে তিনি সংযোগ স্থাপনকারী সেতু হিসাবেও কাজ করেছেন। সেই পুরানো ভূমিকায় তাকে আবারও লক্ষ্য করা গেল। এটা বেশ উল্লেখযোগ্য বিষয়।’
তবে রামলীলা ময়দানে আরো এক নেতা বেশ সক্রিয় ছিলেন।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘রাহুল গান্ধী কিন্তু ধীরে ধীরে মঞ্চের সামনে চলে আসছেন। এসআইআর ও জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের ইস্যু নিয়ে তাকে বেশ কয়েকবার পথে নামতে দেখা গিয়েছে এবং তার সাম্প্রতিক কর্মসূচি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তিনিও তার রাজনৈতিক কৌশল বদলাচ্ছেন। ইন্ডিয়া ব্লকের মুখ হয়ে উঠতে চাইছেন।’
তার মতে, ‘কংগ্রেসের সঙ্গে মমতার সম্পর্কের সমীকরণও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ভবিষ্যতে কংগ্রেসের সঙ্গে সমীকরণ কোনদিকে যায় সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে।’
দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এবং এসআইআর ইস্যু নিয়ে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল ইন্ডিয়া জোট। এর আগের দিন দিল্লিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাড়িতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট আনতে মক পার্লামেন্টও অনুষ্ঠিত হয়৷
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবিতে সিজেপির আন্দোলন কর্মসূচির ডাক এবং তাতে বিজেপি বিরোধীদের সমর্থন, রাহুল গান্ধীর সুপ্রিম কোর্টের অভিমুখে যাত্রা, শীর্ষ আদালতে পিটিশন দায়ের-সহ একাধিক ঘটনাকে ঘিরে রাজধানীর উত্তাপ ক্রমশ উর্দ্ধমুখীই থেকেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এসআইআর ও জ্ঞানেশ কুমার ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে বেশ সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
এই ইস্যু যে বিরোধীদের আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটা সুযোগ এনে দিয়েছে তা যেমন মেনে নিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, তেমনই রোববারের সমাবেশের নিজস্ব কিছু গুরুত্ব রয়েছে বলেও মনে করেন তারা।
আরতি জেরথ বলেন, ‘বিজেপি যেখানে বিরোধী শূন্য রাজনৈতিক ময়দান গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সেখানে রামলীলা ময়দানের এই জমায়েত নিজেই একটা বড় বার্তা। বিরোধীরা আবার এক মঞ্চে আসার জন্য একটা বড় বিষয় পেয়েছে এবং এটা ভুললে চলবে না যে এই ইস্যু কিন্তু সাধারণ মানুষকেও প্রভাবিত করে।’
ভারতীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসেছিলেন এই সমাবেশে এবং তারা সকলেই যে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থক তা নয়।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারী এক পেশাদার প্রকৌশলী বলেছেন, ‘আমি একজন সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নই। কিন্তু আমি জানি এই বিষয়টা খুবই গুরুতর। যদি ভোট চুরি হয়ে থাকে, তবে এর চেয়ে বড় বিষয় আর হতে পারে না।’

রামলীলা ময়দানের মঞ্চ থেকে বিজেপিকে সরাসরি নিশানা করতে ছাড়েনি কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি-সহ অন্যান্য শরিক দলগুলো।
রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আমি দেশের প্রতিটা মানুষকে, প্রত্যেক যুবককে বলছি, জ্ঞানেশ কুমারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে সরানো হবে। জ্ঞানেশ কুমার জেলে যাবেন।’
তিনি বলেন, ‘অমিত শাহ জি বলেছিলেন, নরেন্দ্র মোদী কোথাও যাবেন না। আমি আপনাদের উল্টোটা বলছি। নরেন্দ্র মোদী কোথাও যেতে পারবেন না। যদি তিনি যেতেও চান, আমরা তাকে যেতে দেব না। জ্ঞানেশ কুমারের পর তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
ভাষণের সময় উত্তর প্রদেশে বিজেপি আর জিতবে না বলেই মন্তব্য করেন অখিলেশ ইয়াদভ। তার মতে ২০২৭-এর ভোটে বিজেপি কিছুতেই জিততে পারবে না।
অন্যদিকে, রাজধানীতে দাঁড়িয়ে বিজেপিকে নিশানা করতে ছাড়েননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার কারণ হিসাবে এসআইআর-কে দায়ী করেন। তিনি বলেছেন, "আমরা হারিনি, জোর করে হারিয়েছে। বিজেপি বাংলাকে লুট করেছে। এদের ক্ষমতা থেকে সরাতেই হবে।"
এই পরাজয়ের সঙ্গে এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে যোগ করে পরাজয়ের প্রসঙ্গকে জাতীয়স্তরে রাজনৈতিক ইস্যুতে তুলে ধরতে চাইছেন। পাশাপাশি, তৃণমূলে ভাঙ্গনের পর রাজনৈতিক ভাবে 'প্রাসঙ্গিক' থাকারও চেষ্টা রয়েছে।
আরতি জেরথের কথায়, ‘এই মঞ্চে মমতার উপস্থিতি বড় বিষয়। একদিকে তিনি যেমন বিজেপিকে এই বার্তা পাঠাতে চাইছেন যে রাজনীতি এখনো বিরোধী শূন্য হয়ে যায়নি, তেমনই চেষ্টা করছেন যাতে তার দলের এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়ানো যায়।’
পাশাপাশি যে বামেদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেই দলের এবং তার যুব সংগঠনের নেতা-নেত্রীদের (যারা সিজেপির সঙ্গে আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন তাদের দিকে ইঙ্গিত করে) প্রতি তার সাম্প্রতিক মনোভাবও নজরে এসেছে।
এই প্রসঙ্গে একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় তুলে ধরেছেন শিখা মুখার্জী।
তার কথায়, ‘এর আগেও ইন্ডিয়া জোটের মঞ্চে দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তবে আগে তাকে সমাবেশে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দেখা যেত এখন তিনি পরাজিত এবং তার দল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে।’
পশ্চিমবঙ্গে ভোটে হেরে যাওয়া এবং দলে ভাঙ্গনের পর ঘুরে দাঁড়াতে সচেষ্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার নেতৃত্বাধীন দল। এর জন্য যে তাদের লড়াই করতে হবে সেটাও স্পষ্ট।
তবে এসআইআর ইস্যু এবং বিরোধী জোটের মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার বিষয়টা তার রাজনৈতিক কামব্যাকে কতটা সাহায্য করবে সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে যে ইন্ডিয়া ব্লকের সঙ্গে তার সম্পর্কে 'স্থায়ীত্ব' নিয়েও। সেই আবহে জোট শরিকদের সমীকরণ ভবিষ্যতে কী দাঁড়ায় সে বিষয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন আরতি জেরথ।
তার কথায়, ‘অতীতের অবস্থান থেকে সরে এসে কংগ্রেসের প্রতি তার যে আসক্তি দেখা যাচ্ছে সেটা বিশেষভাবে অর্থবহ। কিন্তু এটা রাজনৈতিক দিক থেকে কতটা তাকে লাভবান করে এবং আগামী ভোটে তারা জোট করে কি না সেটা দেখার বিষয় কিন্তু তা হলেও এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এর তাৎপর্য রয়েছে বৈকি।’
জেরথ বলেন, ‘রাজনৈতিক দিক থেকে ভোটে মমতা বা ইন্ডিয়া ব্লক কতটা লাভবান হয় সেটা দেখার। কারণ ইন্ডিয়া ব্লকের সঙ্গে মমতা বরাবরই কানামাছি খেলে এসেছেন। তিনি ইচ্ছে মতো নিজেকে জোটের অংশ বলেছেন আবার কখনো উল্টো সুরে কথা বলেছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে সমাজবাদী পার্টি, জম্মু এন্ড কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল রেখে এসেছেন।’
যে ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল তার বিশেষ তাৎপর্য ছিল বলে মন্তব্য করেছেন শিখা মুখার্জী।
তার কথায়, ‘জাতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র বরাবরই গুরুত্ব রয়েছে। রামলীলা ময়দানের সমাবেশ এটা তার কামব্যাকের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা ইস্যু নয়। এখানে ইস্যু হলো তার হার ভারতের রাজনীতিতে এসআইআর-এর এফেক্ট হিসাবে একটা প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছে।’
ভারতে ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে সিজেপির আন্দোলনের সময় থেকেই তাদের প্রতি সমর্থন দেখিয়েছেন রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতা। সিজেপি নেতা ও সমর্থকদের পুলিশি ধরপাকড়ের সমালোচনাও করেছেন তারা।
তবে রোববারের অনুষ্ঠানে যে সিজেপি সমর্থন জানালেও তারা কেউ উপস্থিত থাকবে না বলে আগেই জানানো হয়েছিল। এর নেপথ্যে যুক্তিও দেওয়া হয়েছিল। এরই মাঝে শনিবার অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দু'জনের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ কথাও হয়। মি. দীপকেকে পশ্চিমবঙ্গ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।
এই সাক্ষাৎও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সিজেপির মতো কোনো সংগঠনের পাশে যখন যুবসমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে আন্দোলনের ময়দানে দেখা যায়, তখন তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখার সুযোগ দেওয়া বিরোধী রাজনীতির স্বার্থেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
শিক্ষা মুখার্জীর কথায়, ‘যুব সমাজ যে গুরুত্বপূরণ সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন। তিনি যে সিজেপির প্রতি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তার একটা উদ্দেশ্য ছিল, রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়া যে যুব সমাজ রয়েছে তার সমর্থন তিনি চান।’— বিবিসি বাংলা
এমএইচআর