আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৩ এএম
দীর্ঘ কয়েক দশকের সশস্ত্র সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের পর ফিলিপাইনের মুসলিম অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বাংসামোরোর (বার্ম) প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন সাবেক বিদ্রোহী নেতা আবদুলরাওফ মাকাকুয়া।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) কোটাবাটো সিটির পার্লামেন্ট ভবনে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে তিনি এ পদে নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে অঞ্চলটিতে দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অবসান ঘটল।
৮০ সদস্যের বাংসামোরো পার্লামেন্টে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে মাকাকুয়া পেয়েছেন ৫১ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সহযোদ্ধা মুরাদ ইব্রাহিম পেয়েছেন ২৭ ভোট। একজন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন এবং একজন সদস্য অসুস্থতার কারণে অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় অঞ্চলটির প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রথমবারের মতো নিজেদের সরকারপ্রধান বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৪ শতাংশের বেশি।
নির্বাচনে মাকাকুয়ার নেতৃত্বাধীন বাংসামোরো ফেডারেলিস্ট পার্টি ১৬টি দলীয় আসন পায়। অন্যদিকে মুরাদ ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড বাংসামোরো জাস্টিস পার্টি পায় ১৫টি আসন।
৬৯ বছর বয়সী আবদুলরাওফ মাকাকুয়া ‘স্যামি গামবার’ নামেও পরিচিত। কৈশোরে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোসের সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
মাকাকুয়া একসময় ফিলিপাইনের বিদ্রোহী সংগঠন মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের (এমআইএলএফ) গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। গেরিলা সংগঠনটির সশস্ত্র শাখা বাংসামোরো ইসলামিক আর্মড ফোর্সেসের প্রধান স্টাফ হিসেবেও দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
২০২৫ সালের মার্চে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র তাকে অন্তর্বর্তীকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এর আগে ২০১৯ সাল থেকে এ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মুরাদ ইব্রাহিম।
মাকাকুয়া নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রথম বক্তব্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, ‘প্রকৃত স্বশাসনের পথে এটি দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাংসামোরোর জনগণের জন্য শক্তিশালী সরকার গড়ে তুলতে শুধু অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, বোঝাপড়া এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা’।
শুক্রবারের উদ্বোধনী অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র।
নবনির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বাংসামোরোর এই অর্জন শুধু ওই অঞ্চলের জনগণের বিজয় নয়, বরং সমগ্র মিনদানো ও ফিলিপাইনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য’।
এদিকে একই অধিবেশনে আমের জাকারিয়া রাকিমকে পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত করা হয়। তিনিও ৫১ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ ইয়াকুব পেয়েছেন ২৭ ভোট।
এছাড়াও নতুন পার্লামেন্টে ৪০ জন দলীয় প্রতিনিধি, ৩২ জন নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও খাতের আটজন প্রতিনিধি রয়েছেন। পার্লামেন্টটির মেয়াদ পাঁচ বছর, যা ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
প্রসঙ্গত, ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনদানো দ্বীপ ও আশপাশের এলাকায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র আন্দোলন চলেছে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে এ সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। দীর্ঘ সংঘাতে প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রাণ হারান। এছাড়াও সংঘাতের কারণে অঞ্চলটির অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৪ সালে ফিলিপাইন সরকার ও এমআইএলএফ-এর মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির ভিত্তিতেই ২০১৯ সালে গঠিত হয় বাংসামোরো অটোনোমাস রিজিয়ন ইন মুসলিম মিনদানো (বার্ম)।
সূত্র: আরব নিউজ, আনাদোলু
এমএইচআর