Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

আফগানিস্তানে তালেবান আসলেই কি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ করেছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

আফগানিস্তানে বিনামূল্যে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের একটি মানবিক কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা শতাধিক রোগীর চিকিৎসা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দেশটির তালেবান সরকার চিকিৎসাপদ্ধতিটিকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ করেছে। তবে এ নিয়ে ভিন্ন তথ্যও পাওয়া গেছে। 

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম নয়া দওর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য চিকিৎসকদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব পাকিস্তানি ডিসেন্ট অব নর্থ আমেরিকা’ (এপিপিএনএ)-এর সহায়তায় পরিচালিত এ কর্মসূচি চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। 

তবে তালেবান কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশের পর দেশটিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তালেবান কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় আপত্তির কথা উল্লেখ করে এ ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত নিষেধাজ্ঞার তথ্য পাওয়া যায়নি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এপিপিএনএ উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত চিকিৎসকদের একটি সংগঠন। সংগঠনটি ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানে বিনামূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ ও প্রতিস্থাপন কার্যক্রমে সহায়তা করে আসছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশটির বিভিন্ন হাসপাতালে দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে দান করা কর্নিয়া পাঠানো হয়।

সংগঠনটির কর্নিয়া কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ফাওয়াদ জাফর জানান, পাকিস্তানে এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করা হয়েছে। চলতি বছর আফগানিস্তানে চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হয়। এর আওতায় দেশটিতে ১৫০টির বেশি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি আফগানিস্তানের তিনজন চক্ষু বিশেষজ্ঞকে পাকিস্তানের পেশোয়ারে এ অস্ত্রোপচারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে স্থানীয়ভাবেই রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়।

তবে আগস্টে তালেবান কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশের পর কর্মসূচিটি বাধার মুখে পড়ে। 

কাবুলের নূর আই স্পেশালিটি হাসপাতালের চিকিৎসক নূর জামান হাশিম ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে জানান, তলেবান সরকারের নির্দেশ পাওয়ার আগে হাসপাতালটিতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রায় ৯০টি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। নির্দেশের পর সেগুলো বন্ধ রাখতে হয়েছে। 

taleban

জালালাবাদের একটি হাসপাতালেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানা গেছে।

এদিকে তালেবান সূত্র বলছে, গত আগস্ট মাসে সরকার মৌখিক নির্দেশে এই কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত রাখতে বলে, তবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। কর্তৃপক্ষের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা ও প্রতিস্থাপনের ধর্মীয় বৈধতা।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশটির নীতি ও নৈতিকতা-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয় মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে চোখসহ বিভিন্ন অঙ্গের কথাও উল্লেখ করা হয়। যদিও দান করা কর্নিয়া দিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি ওই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। 

সূত্র বলছে, মানবদেহের অঙ্গ বেচাকেনা আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ। তালেবান সরকারের আপত্তি হলো—এই কর্নিয়াগুলো সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে এবং দাতার পরিচয় নিশ্চিত করে আনা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা। বিশেষ শর্তে দাতার পরিচয় স্পষ্ট থাকলে তবেই অঙ্গ প্রতিস্থাপনকে তারা বৈধতা দিতে চায়।

আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমিও নির্দিষ্ট শর্তে মৃত ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপনকে বৈধ বলে মত দিয়েছে। দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ক্ষেত্রে যথাযথ সম্মতি ও অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বাণিজ্যিক লেনদেন নিষিদ্ধ রাখার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তান হয়ে একটি মর্কিন সংস্থার আফগানিস্তানে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও তালেবানের উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের পর আফগানিস্তানের ভেতরে এপিপিএনএ-কে কাজ করতে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কতটুকু ঝুঁকিমুক্ত, তা নিয়ে তালেবান সরকারের নীতিনির্ধারকরা গভীরভাবে ভাবছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো বিদেশি উদ্যোগের নেপথ্য উদ্দেশ্য নিয়ে এই ধরনের কৌশলগত সতর্কতা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

তবে কর্মসূচি বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীরা। তাদের অনেকেই বিস্ফোরণ, দুর্ঘটনা কিংবা কর্মক্ষেত্রে আঘাতের কারণে চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় ছিলেন। আফগানিস্তানে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও দান করা কর্নিয়ার সংকট থাকায় এ ধরনের চিকিৎসার সুযোগ এমনিতেই সীমিত। ফলে কর্মসূচি স্থগিত থাকলে অপেক্ষমাণ রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

ইতোমধ্যেই এপিপিএনএ কর্তৃপক্ষ তালেবান প্রশাসনের কাছে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কার্যক্রম পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। 

সূত্র: নয়া দওর, আউটলুক ইন্ডিয়া

 

এমএইচআর