আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৪ এএম
গত সপ্তাহের দাঙ্গা ও লুটপাটের রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ফ্রান্সে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। আগামী শনিবারের এই বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশকে সহায়তা করতে সেনা মোতায়েন ও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে সহিংসতা মোকাবিলায় নিজেদের ব্যর্থতার কথাও স্বীকার করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেন, ‘আগামী শনিবার ব্যাপক পরিসরে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হবে।’ গত ১৭ অক্টোবর প্যারিস, মার্সেই, লিয়নসহ বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা ও লুটপাটের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
সংসদে বিতর্কের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও কাজে লাগানো হবে। শহরের কেন্দ্রস্থলগুলোতে নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার মুখে নিরাপত্তা কার্যক্রমের কৌশল পরিবর্তনেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।
কারফিউয়ে কমেছে উত্তেজনা
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু পরিস্থিতিকে ‘সহিংসতা ও প্রজাতন্ত্রের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার’ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি অস্থিরতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেন। তবে এসব গোষ্ঠীর অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনসেবার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সরকার তা যথাযথভাবে আমলে নেয়নি।
সহিংসতার ব্যাপকতা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতা ফ্রান্সে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বেড়েছে। জনমত জরিপে উগ্র ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী প্রার্থীরা ভালো অবস্থানে রয়েছেন।
সহিংসতাপ্রবণ কয়েকটি এলাকায় স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারি করার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে। সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় ১৮ বছরের কম বয়সীদের চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এসব কারফিউ বহাল রাখার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
লেকর্নু স্বীকার করেন, গত সপ্তাহে পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি ছিল। আগে থেকে নির্ধারিত পুলিশ সদস্যদের ছুটি বাতিল না করাও ছিল ভুল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘যা ঘটেছে, তার জন্য আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি আমার দায়িত্বের অংশটুকু স্বীকার করছি।’
সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানে সংসদে তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাস্তায় সংঘটিত সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ২০০ জন তদন্তকারী নিয়োগ করেছে কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরের একটি ঐতিহাসিক পৌর ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দাঙ্গার সময় আগুনে ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি আগে থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারির তালিকায় ছিলেন এবং একটি উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
প্যারিসের রেনেসাঁ পার্টির সংসদ সদস্য সিলভাঁ মায়ার রয়টার্সকে বলেন, কিছু অ্যাপ ‘দাঙ্গাকারী ও লুটেরাদের জন্য ওয়াকিটকির মতো যোগাযোগব্যবস্থায়’ পরিণত হয়েছে।
সহিংসতার প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের অর্থনীতিতেও। নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। মঙ্গলবার দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
সুপারমার্কেট চেইন ক্যারেফুর জানিয়েছে, চুরি ও ভাঙচুরের কারণে তাদের কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেছে।
শনিবার ফের বিক্ষোভের ডাক
ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউনেফ (UNEF) আগামী শনিবার আবারও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার মান কমছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাব রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা। সামাজিক মাধ্যমে সংগঠনটি বলেছে, ‘আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’
এদিকে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ নামে পরিচিত কয়েকটি গোষ্ঠী জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। ২০১৮ সালে মাখোঁর প্রথম মেয়াদে পেট্রলের ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। তখন কয়েক মাস ধরে সড়ক অবরোধ চলে এবং সরকারকে ব্যয়বহুল বিভিন্ন ছাড় দিতে হয়। সূত্র: রয়টার্স।
এমআর