আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৩ এএম
চীনা কোম্পানি থেকে আমদানিকৃত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে শক্তিশালী ও উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। এটি তৈরি করা সম্ভব হলে ইসরায়েল ও সৌদি আরবকে নিখুঁত নিশানার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারবে গোষ্ঠীটি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠেছে। প্রতিবেদনটি ছাপিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা চীনা কোম্পানি থেকে আমদানিকৃত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ইরানের তৈরি ‘খেবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্রের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করছে। ইরানি এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁত নিশানায় লক্ষ্যভেদে সক্ষম।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হুথিদের তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্র সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার ৯০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পাড়বে। এর ফলে পুরো সৌদি আরব এবং ইসরায়েল সরাসরি হুথিদের হামলার আওতায় চলে আসবে।
জানা গেছে, হুথি বিদ্রোহীদের ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু, এরপরেও হুথিরা ইয়েমেনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই গোষ্ঠী ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর ইয়েমেনের সংঘাতও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, মার্কিন-ইরান যুদ্ধের প্রভাব আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার অংশ হিসেবেই ইয়েমেনে উত্তেজনা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইরান। সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রোববার এক বিবৃতিতে এ প্রস্তাবের কথা জানান। পরে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই অবস্থানের কথা পুনরায় তুলে ধরে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দুটি পৃথক চালানের গোপন সামগ্রী জব্দ করার পর পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে অস্ত্র ও সংঘাত নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ। সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিভিন্ন উপকরণ গোপনে দেশে আনার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিন্টজ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, এসব যন্ত্রাংশ আমদানির ঘটনা থেকে ধারণা করা যায়, হুথিরা হয়তো ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে অথবা সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে তাদের প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি সফল না-ও হতে পারে। হিন্টজ আরও জানান, হুথিদের অস্ত্র তৈরির স্থাপনাগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আড়াল করে রাখা হয়েছে। এ কারণে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।
অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মানার দাবি চীনের
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের ওপর জাতিসংঘের আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে অনুসরণ করার কথা জানিয়েছে চীন সরকার। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের আনা কিছু উপকরণ বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব হলেও, অন্য কিছু সরঞ্জাম বিশেষভাবে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছিল।
জব্দ করা সামগ্রীর তালিকায় ছিল বিশেষভাবে তৈরি ধাতব ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ। এসবের মধ্যে ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মূল কাঠামো বা এয়ারফ্রেম তৈরির উপাদানও রয়েছে। এ ছাড়া ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্রের উড্ডয়নকালে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যবহৃত ফিন বা পাখার মতো অংশ এবং খেবার শেকান সিরিজের কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট মোটরের কিছু উপাদান উদ্ধার করেছে।
এর পাশাপাশি কিছু বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার সরঞ্জাম ও কাঁচামালও জব্দ করেছে ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার করা কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ‘অ্যাবলেটিভ মেটেরিয়াল’। ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও গতিবৃদ্ধির সময় প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি হয়। এই উপাদান ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন অংশকে সেই তাপের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়।
ইরানের ‘খেবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব কোথায়?
গত জুলাইয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ইরান খেবার শেকান নামের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। তুলনামূলক কম খরচ, সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার সুবিধা এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার কারণে এই ক্ষেপণাস্ত্রকে কার্যকর বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর পাল্লা কমপক্ষে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, কঠিন জ্বালানিচালিত মধ্যম পাল্লার খেবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্রের পরিচালনব্যবস্থা ইরানের পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র মডেলগুলোর তুলনায় আলাদা। আগের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে জ্বালানি ভরতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতো। কিন্তু খেবার শেকানে আগে থেকেই জ্বালানি ভর্তি থাকে। ফলে এগুলো দ্রুত ট্রাক কিংবা অন্য পরিবহনে তুলে উৎক্ষেপণের স্থানে নেওয়া সম্ভব।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতিতে সময় কম লাগে এবং দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে হামলা চালানোর সুযোগ তৈরি হয়। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে নজরদারিতে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে এড়িয়ে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
এসআই