Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

মক্কা জোটের সামরিক সক্ষমতা কতটুকু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের আঁচ ছড়িয়েছে আশেপাশের দেশগুলোতেও। ইরান একা যেমন হামলা চালিয়েছে গাল্ফের দেশগুলোতে, তেমনি সক্রিয় হয়েছে তার প্রক্সি বাহিনীগুলো। 

এতে বড় ধাক্কা লেগেছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে। আঞ্চলিক শক্তিকে পুনরায় সংহত করতে সক্রিয় হচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। 

অতিদ্রুতই সৌদিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। এতে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে এই জোটের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে।

২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, এ জোটের তিন সদস্য দেশের সম্মিলিত সক্রিয় সেনা সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। 

এ ছাড়া তাদের রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ সামরিক বিমান, ৬ হাজার ট্যাংক ও ৩৪০টিরও বেশি নৌযুদ্ধের সরঞ্জাম।

গত ৭ আগস্ট সৌদির পবিত্র নগরী মক্কায় এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন- সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। 

এই তিন সদস্য দেশের সম্মিলিত বার্ষিক সামরিক ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে সৌদির প্রতিরক্ষা বাজেট সবচেয়ে বেশি- ৬ হাজার ৩৯০ কোটি ডলার, তুরস্কের ৫ হাজার ১৪০ কোটি ডলার এবং পাকিস্তানের ৯১০ কোটি ডলার। 

সামরিক জনবলের দিক থেকেও এই জোট বেশ সমীহ জাগানিয়া। তিন দেশের মোট নিয়মিত সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ, যেখানে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সেনা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান। এছাড়া তুরস্কের ৪ লাখ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার নিয়মিত সেনা।

জোটের আকাশসীমা সুরক্ষায় যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও প্রশিক্ষণ বিমান মিলিয়ে তিন দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মোট ৩ হাজার ৪১৫টি সামরিক উড়োজাহাজ। এর মধ্যে পাকিস্তানের ১ হাজার ৩৯৭টি, তুরস্কের ১ হাজার ১০১টি এবং সৌদির রয়েছে ৯১৭টি যুদ্ধবিমান। 

স্থলভাগে এই তিন শক্তির অধীনে রয়েছে ৬ হাজার ৪৬টি ট্যাংক এবং ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান। ট্যাংক বহরে পাকিস্তানের সংখ্যা ২ হাজার ৬৭৭টি, তুরস্কের ২ হাজার ২৮৪টি এবং সৌদি আরবের রয়েছে ১ হাজার ৮৫টি। 

সমুদ্রসীমায় জোটের সম্মিলিত নৌবহরে রয়েছে মোট ৩৪৪টি যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান। যার মধ্যে ৩৩টি ফ্রিগেট, ২৪টি কর্ভেট এবং ২২টি সাবমেরিন অন্তর্ভুক্ত। 

নৌ শক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা তুরস্কের রয়েছে ১৯২টি নৌযান, পাকিস্তানের ১২০টি এবং সৌদি আরবের রয়েছে ৩২টি। পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান, ন্যাটো সদস্য তুরস্কের ড্রোন ও আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি এবং সৌদি আরবের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সমন্বয় এই জোটকে অঞ্চলের অন্যতম পরাশক্তিতে রূপ দেয়ার সক্ষমতা রাখে। 

সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবের ওপর কোনো ধরনের অযাচিত আগ্রাসন বা ইয়েমেন সংকটের প্রভাব সৌদিতে পড়লে নিশ্চিতভাবেই মক্কা চুক্তি কার্যকর করা হবে।

সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক গত ৫ সেপ্টেম্বর ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’-এর আওতায় যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। 

এর মধ্যে রয়েছে হুথিদের হুমকির মুখে থাকা সৌদি আরবে যৌথ সামরিক বাহিনী মোতায়েন ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা। 

ইরান ও তার মদদপুষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে সৌদি আরব যেসব নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে রিয়াদে জোটের ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’র এক জরুরি বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। 

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা মোকাবিলায় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় ও সৌদি আরবে দ্রুত সেনা মোতায়েন করতে সম্মত হয়েছে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গত সোমবার এ তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক জরুরি বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। গত ৭ আগস্ট ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ বা ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ নামের এ চুক্তি সই হওয়ার পর এই প্রথম এটির কার্যকারিতা শুরু হলো।

চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন সনদের একটি মূলধারার সঙ্গে এ চুক্তির হুবহু মিল রয়েছে।

হুতিদের গত মাসে দখল করা এলাকাগুলো পুনর্দখলে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী একটি পাল্টা অভিযান শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ ঘোষণা এল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান জানান, ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের হামলা এবং এর পেছনে যারা জড়িত, তাদের জবাব দিতে এ জোটের আওতায় ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ সক্রিয় করার বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে।

খালিদ বিন সালমান আরও বলেন, এ জোট সৌদি আরব এবং পবিত্র স্থানগুলোর ওপর হওয়া হামলা মোকাবিলায় তিন দেশের সংহতি ও ঐক্য আবারও দৃঢ় করেছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত একটি আলাদা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ তিন দেশ চুক্তি অনুযায়ী তাদের পূর্বনির্ধারিত সামরিক শক্তি ও সক্ষমতার জোগান দেবে এবং সৌদি আরবে তাদের দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করবে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, অঙ্গীকারগুলো অনুমোদিত চুক্তি ও প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন মেনেই বাস্তবায়ন করা হবে।

হুতিদের গত মাসে দখল করা এলাকাগুলো পুনর্দখলে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী একটি পাল্টা অভিযান শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ ঘোষণা এল। 

সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনি বাহিনী জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখল করেছে ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে।

এ জোট সৌদি আরব এবং পবিত্র স্থানগুলোর ওপর হওয়া হামলা মোকাবিলায় তিন দেশের সংহতি ও ঐক্য আবারও দৃঢ় করেছে। 

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর চলতি অভিযানে নিজেদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। তাদের ১০০টি যুদ্ধবিমান এ অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও উপকূলীয় শহর রাবিগের আরামকো তেল শোধনাগারে হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটি আরও দাবি করেছে যে তারা একটি বিমানবন্দর, একটি বিমানঘাঁটিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।

তবে হুতিদের এ দাবির বিষয়ে রিয়াদের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চয়তা কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র হতে থাকা সংঘাতের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই মূলত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

গত আগস্টে এ জোটের প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। এর কিছুদিন পরই ইয়েমেনে হুতিরা তাদের অভিযান শুরু করে। পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে থাকে।

-এমএমএস