Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলি বর্বরতার ৩ বছর, হামাস কি গাজা শাসন করতে পারবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

ইসরায়েলে হঠাৎ ঢুকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজার সাবেক শাসকগোষ্ঠী হামাসের সেই ভয়াবহ হামলার তিন বছর পূর্ণ হলো আজ। 

ওই হামলার পর বদলে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এখন অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ গাজা উপত্যকার সীমানাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। 

হামলার বর্ষপূর্তিতে অবশিষ্ট জঙ্গিদের সম্ভাব্য হামলার চেষ্টার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত এ কঠোর অবস্থানের আড়ালে রয়েছে এক আমূল পরিবর্তিত বাস্তবতা; আর তা হলো প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসন করা হামাসের আর আগের দাপট নেই।

অবিরাম যুদ্ধের তিন বছরে হামাসের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের শীর্ষ রাজনীতিক ও যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া প্রায় সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং রাষ্ট্রসদৃশ আনুষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী চলতি বছরের জুলাই মাসে গোষ্ঠীটি গাজায় তাদের বেসামরিক প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়। 

দোহায় নির্বাসিত খলিল আল-হাইয়াকে ওই মাসেই হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান নির্বাচিত করা হয়। তিনি এমন এক খণ্ডিত সংগঠনের দায়িত্ব নেন, যাকে সশস্ত্র শাসকের ভূমিকা থেকে সরে এসে ভূগর্ভস্থ গেরিলা বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হতে হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সামরিক শাখা আল কাসেম ব্রিগেড একটি সুসংগঠিত ও সুবিন্যস্ত সেনাবাহিনী হিসেবে কার্যক্রম চালিয়েছিল। 

তখন তাদের ৩০ থেকে ৪০ হাজার সক্রিয় যোদ্ধা ছিল, যারা পাঁচটি আঞ্চলিক ব্রিগেড, ২৪টি ব্যাটালিয়ন এবং প্রায় ১৪০টি কোম্পানিতে বিভক্ত ছিল।

তাদের ছিল অত্যাধুনিক সামরিক-শিল্প সক্ষমতা, যার মাধ্যমে তারা দূরপাল্লার রকেট, ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন তৈরি করতে পারত। 

এর পেছনে ছিল ‘গাজা মেট্রো’ নামে পরিচিত শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।

তিন বছর পর, ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, হামাসের আনুষ্ঠানিক সামরিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে।

তাদের সুসংগঠিত ব্যাটালিয়ন কাঠামো আর নেই। গোষ্ঠীটির ভারী অস্ত্রশস্ত্র, রকেট তৈরির কারখানা এবং প্রকাশ্য কমান্ড পোস্টগুলোর অধিকাংশই ধ্বংস বা দখল হয়ে গেছে। 

গাজা উপত্যকার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ দখল, সীমানা-সংলগ্ন বাফার জোন অথবা নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ বিভাজন রেখা বরাবর নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে।

হামাসের সামরিক সক্ষমতা কমার মূল কারণ ছিল তাদের শীর্ষস্থানীয় কমান্ডারদের একের পর এক নির্মূল করার লক্ষ্যে পরিচালিত সুনির্দিষ্ট অভিযান।

ইসমাইল হানিয়া: হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর চেয়ারম্যান; ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তেহরানে তাকে হত্যা করা হয়।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার: ৭ অক্টোবরের হামলার মূল পরিকল্পনাকারী এবং গাজায় হামাসের প্রধান; ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাফায় ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত হন।

মোহাম্মদ দেইফ: আল কাসেম ব্রিগেডের কমান্ডার; ২০২৪ সালের জুলাই মাসে খান ইউনিসে এক ব্যাপক বিমান হামলায় নিহত হন।

মোহাম্মদ সিনওয়ার: ইয়াহিয়ার ভাই এবং গাজায় সামরিক কমান্ডার হিসেবে তার উত্তরসূরি; ২০২৫ সালের মে মাসে তাকে হত্যা করা হয়।

ইজ আল-দিন আল-হাদ্দাদ: গাজা সিটি ব্রিগেডের কমান্ডার, যিনি কিছু সময়ের জন্য সামগ্রিক সামরিক নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েছিলেন; ২০২৬ সালের মে মাসে নিহত হন।

শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব ও কাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়ায়, হামাসের সশস্ত্র শাখার অবশিষ্ট অংশ এখন বিকেন্দ্রীভূত ও স্বায়ত্তশাসিত ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

সুড়ঙ্গের টিকে থাকা অংশ, শহরের ধ্বংসস্তূপ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কার্যক্রম পরিচালনাকারী তিন থেকে পাঁচজন যোদ্ধার এই ছোট দলগুলো মূলত স্বল্প-প্রযুক্তির গেরিলা কৌশল যেমন আইইডি বা হাতে তৈরি বিস্ফোরক, স্বল্প-পাল্লার স্নাইপার হামলা এবং ইসরাইলি টহল দলের ওপর অতর্কিত ‘হিট-অ্যান্ড-রান’ হামলার ওপর নির্ভরশীল।

ইয়াহিয়া সিনওয়ারের আমলে সংগঠনের মূল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ছিল গাজার ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারগুলোর ভেতরে। সিনওয়ারের কট্টরপন্থি সামরিক অংশটি দোহায় অবস্থিত রাজনৈতিক ব্যুরোকে নিজেদের অধীনস্থ করে রেখেছিল এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই সরাসরি যুদ্ধবিরতির শর্ত ও কৌশল নির্ধারণ করত।

সিনওয়ারের মৃত্যু এবং এরপর একটি অস্থায়ী কমিটির অধীনে কয়েক মাস ধরে চলা যৌথ নেতৃত্বের পর, সংগঠনটি নির্বাসিত অবস্থান থেকে পুনরায় নিজেদের কার্যক্রম গুছিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

জুলাই মাসে শুরা কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর অনুষ্ঠিত অভ্যন্তরীণ ভোটে খলিল আল-হাইয়া আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর পঞ্চম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। 

ইসরায়েলের একাধিক হত্যাচেষ্টা থেকে রক্ষা পাওয়া হামাসের প্রবীণ রাজনীতিক আল-হাইয়া সংগঠনটির অভ্যন্তরে বাস্তববাদী অথচ কঠোরপন্থি অবস্থানের এক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন।

সশস্ত্র প্রতিরোধের মূল আদর্শ বজায় রাখার পাশাপাশি, আল-হাইয়া গাজার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর সম্পূর্ণ ধসের বিষয়টি অনুধাবন করেন এবং আনুষ্ঠানিক বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার রাজনৈতিক পদক্ষেপে নেতৃত্ব দেন।

শুরা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইসমাইল দারবিশ এবং পশ্চিম তীরের ব্যুরো প্রধান জাহের জাবারিনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সময় আল-হাইয়ার মূল মনোযোগ এখন সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা; মিসর, কাতার ও তুরস্কের আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো এবং যুদ্ধ-পরবর্তী যেকোনো রাজনৈতিক আলোচনায় হামাসের অবস্থান নিশ্চিত করার দিকে নিবদ্ধ রয়েছে।

২০০৭ সালের জুন মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯ বছর ধরে হামাস গাজায় কেবল একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় সত্তা হিসেবে কার্যক্রম চালিয়েছে। 

তারা সরকারি মন্ত্রণালয় পরিচালনা, কর আদায়, পুলিশ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ, দেওয়ানি আদালত পরিচালনা এবং সরকারি স্কুল ব্যবস্থা ব্যবস্থাপনার মতো কাজগুলো করেছে।

চলতি বছরের ৬ জুলাই সেই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে, যখন হামাস গাজায় তাদের বেসামরিক প্রশাসনিক কমিটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয়।

প্রশাসনিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ছেড়ে দিলেও দৈনন্দিন জীবন থেকে হামাসের উপস্থিতি পুরোপুরি মুছে যায়নি। যেসব এলাকায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সীমিত, সেখানে হামাসের গোপন ও ছায়াশক্তিসদৃশ এনফোর্সমেন্ট ইউনিটগুলো স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

অনানুষ্ঠানিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে কাজ করা মুখোশধারী সশস্ত্র ব্যক্তিরা স্থানীয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, অপরাধী চক্র এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে সহিংস সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এই গোষ্ঠীগুলো মানবিক সহায়তা বিতরণের পথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল।

গত ৩৬ মাসে গাজার ভেতরে হামাসের প্রতি জনমনে গভীর ও বেদনাদায়ক পরিবর্তন এসেছে। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির কারণে জাতীয়তাবাদী মনোভাব ও ইসরাইলবিরোধী ক্ষোভ এখনও প্রবল থাকলেও, হামাসের একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতি মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ৬৮ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং উপত্যকার মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন।

বর্তমানে ২ লাখ ৭৯ হাজারেরও বেশি মানুষ বন্যাপ্রবণ তাঁবু অথবা এমন সব ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপে আশ্রয় নিয়েছেন, যেগুলো অবিলম্বে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট অবরুদ্ধ অঞ্চলটিতে অব্যাহত রয়েছে।

২০২৫ সালের শেষভাগে এবং চলতি বছরজুড়ে গাজার মধ্যাঞ্চল ও খান ইউনিসে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ এবং জনপ্রশাসন থেকে হামাসের সরে দাঁড়ানোর দাবি জানান।

হামাস কঠোর দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার এবং বাড়িঘরে তল্লাশির মাধ্যমে এর জবাব দেয়। এতে সাধারণ জনগণ এবং সংগঠনটির টিকে থাকা উগ্রবাদী নেতৃত্বের মধ্যকার দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। হামাসের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে দীর্ঘকাল কোণঠাসা হয়ে থাকা স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও গোত্রভিত্তিক নেটওয়ার্কগুলো ক্ষমতার এই শূন্যতার সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।

উত্তর গাজা ও রাফার কিছু অংশে প্রভাবশালী পরিবারগুলো নিজস্ব আত্মরক্ষামূলক মিলিশিয়া বা সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে। হামাসের ত্রাণবাহী ট্রাক দখল কিংবা অনানুষ্ঠানিক কর আরোপের চেষ্টা সক্রিয়ভাবে প্রতিহত করেছে তারা।

হামাস আদৌ গাজায় পুনরায় তাদের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কি না, তা বিচার করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিতকারী চারটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন।

ইসরায়েল ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কঠোর আপত্তি: হামাস যাতে গাজার ওপর কোনোভাবেই সামরিক বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে না পারে, সেটিই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা নীতির একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবেই রয়ে গেছে।

হামাসশাসিত গাজায় আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন তহবিল আসার অনুমতি কোনোভাবেই দেবে না ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো আরব রাষ্ট্র।

গাজা পুনর্গঠনের সম্ভাব্য খরচ ৮০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই পুনর্গঠনের অর্থায়নের জন্য গাজার যেকোনো শাসকগোষ্ঠীর অবশ্যই আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন।

‘বোর্ড অব পিস’ কাঠামো: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত ‘গাজা শান্তি পরিকল্পনার’ আওতায় একটি আন্তর্জাতিক শাসন কাঠামো গঠন করা হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে প্রবর্তিত এই কাঠামোটি ‘বোর্ড অব পিস’ নামে পরিচিত এবং এটি গাজার অন্তর্বর্তীকালীন বেসামরিক প্রশাসনের তদারকি করবে।

এই পরিকল্পনায় একটি অরাজনৈতিক ও টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি বেসামরিক কমিটির কথা ভাবা হয়েছে, যারা নগর কার্যক্রম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দেখভাল করবে। এই কমিটিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং আরব শান্তিরক্ষী বাহিনীর সহায়তা দেওয়া হবে।

এই কমিটিতে হামাসের কোনো আসন পাওয়ার সুযোগ স্পষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।

শাসন কাঠামোর অপূরণীয় ধ্বংস: কোনো অঞ্চল শাসন করার জন্য কার্যকর কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন থানা, মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর, কম্পিউটার ডেটাবেস, ব্যাংকিং সংযোগ এবং কর আদায়ের একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থার প্রয়োজন।

যুদ্ধের সময় হামাসের শাসন কাঠামো সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তাই নিরন্তর নজরদারি ও সামরিক চাপের মুখে একদলীয় শাসনব্যবস্থা পুনরায় গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব।

হিজবুল্লাহর কৌশল অনুকরণ: হামাসের পক্ষে তাদের আনুষ্ঠানিক সর্বগ্রাসী একনায়কতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার সম্ভাবনা কম হলেও, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, তাদের সরকারের পতন ঘটার অর্থ এই নয় যে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বও পুরোপুরি মুছে গেছে। মনে হচ্ছে হামাস এমন একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ গ্রহণ করছে, যা লেবাননে হিজবুল্লাহর শুরুর দিকের অবস্থান কিংবা আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সময়কার তালেবানের কৌশলের অনুরূপ।

এই কৌশলের আওতায় তারা একদিকে যেমন আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে গোপনে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ও ভূগর্ভস্থ সশস্ত্র সংগঠনের কাঠামো বজায় রাখছে। পাশাপাশি ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় রাজনীতির ওপর নিজেদের জোরালো নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ধরে রাখছে।

গাজা যুদ্ধের তিন বছর পর মিসরে একটি পরোক্ষ আলোচনা চলছে। এতে মধ্যস্থতা করছেন মিসর, কাতার, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো গাজা শান্তি কাঠামোর দ্বিতীয় ধাপ সম্পন্ন করা।

গাজায় সক্রিয় রাষ্ট্র-বহির্ভূত সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ ও যাচাইযোগ্যভাবে নিরস্ত্রীকরণ করার দাবি তুলেছে ইসরাইল। এর মধ্যে মাটির নিচে থাকা অবশিষ্ট সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।

খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে হামাস অস্ত্র পুরোপুরি সমর্পণ করার দাবির বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছে। এর পরিবর্তে তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে শর্ত হলো—একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথ সুনিশ্চিত করতে হবে।

ভবিষ্যতে অস্ত্র চোরাচালান রোধে গাজা-মিসর সীমান্তে স্থায়ী বহুজাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।

রামাল্লাহভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের চেষ্টা করলেও, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং ইসরাইলের রাজনৈতিক বাধার কারণে প্রস্তাবিত ‘টেকনোক্র্যাটিক ব্রিজ’ নিকট ভবিষ্যতের জন্য প্রধান প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে হামাস বর্তমানে তার সামরিক, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

তবে, এই শূন্যস্থান পূরণে যদি একটি কার্যকর, বৈধ ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের ব্যবস্থাসম্পন্ন ফিলিস্তিনি-নেতৃত্বাধীন প্রশাসন গড়ে তোলা না যায়, তবে গাজা দীর্ঘস্থায়ী ‘ওয়ারলর্ড-তন্ত্র’ বা স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্যের কবলে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

সে ক্ষেত্রে হামাসের ভূগর্ভস্থ অবশিষ্ট শক্তি বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই অন্তহীন বিদ্রোহ চালিয়ে যেতে পারে।

-এমএমএস