আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম
ফ্রান্সে শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং শিক্ষা খাতে অর্থায়নের ঘাটতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রায় ২ হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই কিশোর-কিশোরী।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে শুক্রবার (২ অক্টোবর) প্রায় ৪০০টি স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার স্ট্রাসবুর্গ, মার্সেই, রেন, তুলুজ ও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। কোথাও পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ছোড়া হয়েছে, কোথাও রাস্তায় আবর্জনার স্তূপে আগুন দেওয়া হয়েছে। স্ট্রাসবুর্গে একটি গাড়িতেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার দেশটিতে মোট ৩ হাজার ৭০০টি উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৫৬০টিতে বিক্ষোভ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৪০০টি স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।

রয়টার্স বলছে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট ও স্কুল অবকাঠামোর অবনতি। অনেক স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কারণে শ্রেণিকক্ষে জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে।
প্যারিসের উপকণ্ঠ পান্তাঁর ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের একটি শ্রেণিকক্ষে ৩৫ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে, এমনকি সবার বসার জন্য পর্যাপ্ত চেয়ারও নেই।
যদিও ফরাসি সরকার জানিয়েছে, চলমান সংকট মোবিলায় ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
খসড়া বাজেট অনুযায়ী, শিক্ষক পেনশন বাদে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১.৭ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ৬৫.৫৩ বিলিয়ন ইউরো করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এই বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের একাংশও এতে অসন্তুষ্ট।
আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ফরাসি বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর থেকে প্রায় ২ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই কিশোর।
তিনি বলেছেন, বিক্ষোভের সময় সম্পত্তির ক্ষতি করলে সংশ্লিষ্ট শিশুদের অভিভাবকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।
ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অভিভাবকদের সন্তানদের বিক্ষোভে যেতে নিরুৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি অভিবাবদের সতর্ক করে বলেন, ‘রাস্তায় থাকা শিক্ষার্থীরা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে’।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আন্দোলনে অন্তত ১৭০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে এবং ৬৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন; তাদের মধ্যে ৪০ জন স্কুলপ্রধান। শতাধিক স্কুলে গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির কথাও জানানো হয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও পুলিশের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর পর ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের কথিত সহিংসতা নিয়ে তিনটি তদন্ত শুরু করেছে।
অন্যদিকে চলমান আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ সামনে এনেছে সরকার।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের সঙ্গে বৈঠকে দাবি করেছে- কট্টর বামপন্থী লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই)-এর নেতারা আন্দোলনটি শুরুতে ভূমিকা রেখেছেন।
তবে এলএফআই-এর আইনপ্রণেতা লুই বোয়ার্ড এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রসঙ্গত, ফ্রান্সে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এমনিতেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। তার মধ্যেই স্কুল থেকে রাজপথে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন সরকারের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএইচআর