আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম
হিন্দু ধর্মীয় মেলা সিংহস্থ কুম্ভ ২০২৮-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে রাস্তা চওড়া করার কাজ চলছিল। এর মধ্যেই সেখানে শাহী মসজিদের একটি অংশ সরানোর উদ্যোগের জেরে সোমবার উত্তেজনা ও সহিংস সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।
ছত্রি চক এলাকায় অবস্থিত মসজিদটির আশপাশে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হন। পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষ হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে।
এরপর ওই এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
তবে বিতর্কটি পুরো মসজিদ ভেঙে ফেলা নিয়ে ছিল না। রাস্তা চওড়া করার জন্য প্রস্তাবিত ১৫ মিটার অ্যালাইনমেন্টের মধ্যে পড়া মসজিদের একটি অংশ সরানো নিয়ে এই বিরোধ তৈরি হয়।
রোববার গভীর রাতে প্রশাসন ও মসজিদ কমিটির মধ্যে বৈঠকের পর ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি নিজেরাই সরিয়ে ফেলতে সম্মত হয় মসজিদ কর্তৃপক্ষ।
তবে সোমবার সকালে বিপুল সংখ্যক মানুষ মসজিদের আশপাশে জড়ো হলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।
যে শাহী মসজিদের একটি অংশ রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় এসেছে এবং যাকে ঘিরে উজ্জয়িনীতে এখনো বিপুল পুলিশ মোতায়েন রয়েছে, কী তার ইতিহাস?
মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কিত ওয়াকফ বোর্ডের একটি নথিতে এর নির্মাণসাল ১৩৯০ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মসজিদটিকে ‘শাহী মসজিদ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, ‘মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সহযোগিতা ও অনুদানের’ মাধ্যমে এটি নির্মিত হয়েছিল।
নথিতে উল্লিখিত সাল অনুযায়ী, মসজিদটির ইতিহাস প্রায় ৬৩৬ বছরের পুরোনো।
মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে আদালতে দায়ের করা একটি আবেদনে ১৯২৫ সালের একটি নথিও জমা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে সে সময়েও মসজিদের অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে।
ইন্দোরের ইতিহাসবিদ ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ জাফর আনসারির মতে শাহী মসজিদটি মুঘল-পূর্ব মালওয়া অঞ্চলের সুলতানশাহী আমলের।
তার মতে, ‘উজ্জয়িনী ও মধ্য ভারতের পুরোনো ঐতিহাসিক নথি, এখানকার অন্যান্য স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে এই মসজিদটির নকশা মিলিয়ে দেখা হলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এটি মুঘল আমলের আগের একটি স্থাপনা। বিভিন্ন স্থানে ও নথিতেও এর উল্লেখ রয়েছে।’
তার দাবি, মধ্যপ্রদেশের মান্ডু ও চান্দেরি অঞ্চলেও একই ধরনের স্থাপত্যশৈলী দেখা যায়।
শাহী মসজিদ সম্পর্কিত ১৯২৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি অনুযায়ী, তৎকালীন গোয়ালিয়র স্টেটের টাউন ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের জারি করা এক চিঠিতে মসজিদটিকে ‘মোচিয়ান কি মসজিদ’ বলা হয়েছে।
একই চিঠিতে চক ও রাস্তা সংস্কারের জন্য মসজিদ-সংলগ্ন কিছু জমি অধিগ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে, ‘মূল মসজিদ বাদ দিয়ে’ তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ‘আরাজি’ নেওয়া হবে। 'আরাজি' শব্দের অর্থ জমি, খেত বা ভূমিখণ্ড।
চিঠিটিতে সেই সময়ের মসজিদের অবস্থার বর্ণনাও রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তখন মসজিদটিতে কোনো মিনার ছিল না। পাশাপাশি প্রবেশদ্বার ও প্রাচীর উন্নত করার এবং মিনার নির্মাণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ আদালতে যে নথি জমা দিয়েছে, তার মধ্যে চৌঠা মে, ১৯৪৬ সালের একটি মানচিত্রও রয়েছে।
মানচিত্রটিতে তৎকালীন গোয়ালিয়র স্টেটের উজ্জয়িনীর জেলা ও দায়রা বিচারকের সিলমোহর ও স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মসজিদ পক্ষের দাবি, ওই মানচিত্রে শাহী মসজিদের অবস্থান স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে।
মসজিদ-সংক্রান্ত নথিতে এর দক্ষিণাংশে থাকা দুটি মাজার, প্রধান নামাজের স্থান এবং অন্যান্য অংশেরও উল্লেখ রয়েছে।
ওয়াকফ নথিতে শাহী মসজিদকে ‘ওয়াকফ মসজিদ পঞ্চ মোচিয়ান (শাহী মসজিদ)’ নামে নিবন্ধিত করা হয়েছে।
মসজিদ-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, এটি ওয়াকফ আইন ১৯৫৪-এর আওতায় নিবন্ধিত হয়েছিল এবং ১৩ই সেপ্টেম্বর, ১৯৮৫ সালে মধ্যপ্রদেশ গেজেটে একে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
নথিগুলোতে তৎকালীন উজ্জয়িনী জেলার কালেক্টরের তদন্ত ও প্রত্যয়নপত্রের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পরে এটি ওয়াকফ আইন ১৯৯৫-এর আওতায়ও নিবন্ধিত হয়।
ওয়াকফ-সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, মসজিদের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার অধিকার ওয়াকফ বোর্ড ও পরিচালনা কমিটির।
এছাড়া বলা হয়েছে, ওয়াকফ সম্পত্তি হস্তান্তরের অধিকার কোনো ব্যবস্থাপকের নেই এবং এ-সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপে ওয়াকফ বোর্ডকে অন্তর্ভুক্ত বা অবহিত করতে হবে।
মসজিদের একটি সম্পত্তি-সংক্রান্ত নথিতে মোট আয়তন প্রায় ৪,৬০০ বর্গফুট উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ১৯টি দোকান ও দুটি বাড়ির কথাও রয়েছে।
বর্তমান রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্পে এই কমপ্লেক্সের একটি অংশ প্রস্তাবিত সড়কের আওতায় পড়ছে।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া আপত্তিপত্রে বিকল্প পথের প্রস্তাবও দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, মসজিদের দক্ষিণ দিকে থাকা একটি বাণিজ্যিক ভবনের দিক দিয়ে রাস্তা বাড়ানো যেতে পারে।
এছাড়া পূর্ব দিকের ফুটপাথটিকেও রাস্তার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
মসজিদ পক্ষ ভারতের সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ এবং ৩০০এ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে ৯ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট তাদের প্রথম আবেদন খারিজ করে দিয়ে বলে, মাস্টার প্ল্যান অনুসরণ করা জরুরি।
আদালত জানায়, প্রশাসন নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
আদালতের নথি অনুযায়ী, রাস্তা ১৫ মিটার চওড়া করতে মসজিদের সম্পত্তির একটি ছোট অংশ সরানো প্রয়োজন বলে জানিয়েছিল নগর নিগম (পৌরসভা)।
প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, এই সড়ক গোপাল মন্দির থেকে মহাকাল মন্দির হয়ে শিপ্রা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এবং শাহী সওয়ারি, পেশওয়াই ও সিংহস্থের সময় এখানে বিপুল মানুষের চলাচল হয়।
পরে মসজিদ পক্ষ হাইকোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চে আপিল করে। তবে রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই মসজিদ পক্ষ ও প্রশাসনের মধ্যে তিন ফুট পর্যন্ত অংশ ভাঙা নিয়ে সমঝোতা হয়।
পুরো ঘটনাটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য সিংহস্থ কুম্ভ মেলার প্রস্তুতির সঙ্গে। সিংহস্থ ২০২৮-কে সামনে রেখে উজ্জয়িনীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা সম্প্রসারণ ও অন্যান্য নির্মাণকাজ চলছে।
এই কর্মসূচির আওতায় মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের পৈতৃক বাড়ির একটি অংশও প্রভাবিত হয়েছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি নিজে উজ্জয়িনীর আব্দালপুরা এলাকায় অবস্থিত পৈতৃক বাড়ির যে অংশটা প্রস্তাবিত রাস্তার আওতায় পড়ছে, সেই অংশটা ভাঙার কাজ শুরু করেন।
বাড়িটির প্রায় ২.৯০ মিটার অংশ রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য সরিয়ে দেওয়া হবে। তার বোন কলাবতী যাদবের বাড়িও এই প্রকল্পে প্রভাবিত হয়েছে।
শাহী মসজিদের ঘটনাটিও একই বৃহৎ রাস্তা সম্প্রসারণ কর্মসূচির অংশ।
উজ্জয়িনীর কালেক্টর রোশন সিং বলেন, ‘সিংহস্থ ২০২৮-এর প্রস্তুতির জন্য মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী রাস্তা সম্প্রসারণ ও অন্যান্য নির্মাণকাজ চলছে। সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ স্বেচ্ছায় এতে সহযোগিতা করছেন। অনেকেই নিজেরা তাদের বাড়ি বা ধর্মীয় স্থাপনার সেই অংশ সরিয়ে দিচ্ছেন, যা সড়কের আওতায় পড়ছে। ছত্রি চকের শাহী মসজিদের ক্ষেত্রেও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন স্বেচ্ছায় সেই অংশ সরিয়ে দিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবার কাছে আবেদন করছি, কোনো গুজবে কান না দিয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করুন।’
শাহী মসজিদটি গোপাল মন্দির ও মহাকাল এলাকার কাছাকাছি, পুরনো উজ্জয়িনীর এমন এক অংশে অবস্থিত, যেখানে ধর্মীয় স্থাপনা, বাজার ও আবাসিক এলাকা একে অপরের খুব কাছাকাছি।
উজ্জয়িনীর ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক শংকরলাল বরে বলেন, শহরে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন।
তার মতে, এই শহরে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের একে-অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্যে অংশগ্রহণের বহু উদাহরণ রয়েছে।
ইতিহাসবিদ জাফর আনসারিও উজ্জয়িনীর এই যৌথ সামাজিক জীবনের কথা উল্লেখ করেন।
তার মতে, মহাকাল মন্দির এবং শাহী মসজিদ সংলগ্ন অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের একটি অংশ।
প্রায় ৭০ বছর ধরে শাহী মসজিদে নামাজ আদায় করে আসা মি. ইমরানের মতে, রাস্তা চওড়া হওয়া প্রয়োজন এবং যদি মসজিদের কিছু অংশ সড়কের আওতায় পড়ে, তাহলে স্থানীয় মানুষের আপত্তি থাকা উচিত নয়।
তার বক্তব্য, রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়, অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনার অংশও সরানো হচ্ছে।—বিবিসি বাংলা
এমএইচআর