আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০ পিএম
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পুলিশের একটি চেকপোস্টে আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে আরও ২০ জন।
রেসকিউ ১১২২ কর্মকর্তাদের বরাতে সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) প্রদেশের ডেরা ইসমাইল খান জেলার দারাজিন্দার কাছে আমান মেলা চেকপোস্টে এ হামলা হয়। নিহতদের মধ্যে আটজন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। বিস্ফোরণের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে হতাহতদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
পুলিশ জানিয়েছে, ডেরা ইসমাইল খান-কোয়েটা সড়কের মুঘল কোট ও দারাজিন্দার মধ্যবর্তী এলাকায় এই চেকপোস্ট অবস্থিত।
বিস্ফোরণের ধরন ও কারণ জানতে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। উদ্ধার অভিযানে ২৫ জনের বেশি কর্মী, ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স ও একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি অংশ নিচ্ছে।
রেসকিউ ১১২২ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে ২০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ জনকে দারাজিন্দার বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র ও ডেরা ইসমাইল খানের মুফতি মাহমুদ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি। তিনি হামলাটিকে ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান খাওয়ারিজ’ এর ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিজ’ নামে উল্লেখ করে থাকে।
পুলিশের বরাতে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের এ ধরনের বর্বর হামলা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়া সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ প্রাণ দিয়েছেন এবং রাষ্ট্র তাদের আত্মত্যাগকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় বাড়ছে সন্ত্রাসী হামলা
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খাইবার পাখতুনখোয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে পুলিশ জানিয়েছিল, ডিআই খানের দারাবান এলাকায় একটি চেকপোস্টে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সদস্যদের হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য হতাহত হননি।
এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাটের পুরোনো পুলিশ লাইনসে বড় ধরনের হামলায় ২৩ জন নিহত এবং প্রায় ১০০ জন আহত হন। রাতভর চলা অভিযান শেষে আটজন হামলাকারী নিহত হয় বলে জানানো হয়েছিল।
এসব হামলার পর পাকিস্তান সরকার আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসীদের কথিত আস্তানা লক্ষ্য করে ‘পরিমিত’ বিমান হামলা চালানোর কথা জানায়। সরকারের দাবি, ওই হামলায় ২৮ জনের বেশি সন্ত্রাসী বা জঙ্গি নিহত হয়েছে।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (পিআইসিএসএস) মাসিক তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত উপজেলাগুলো বাদে মূল খাইবার পাখতুনখোয়ায় আগস্টে ৫৪টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ৩৬। অর্থাৎ এক মাসে হামলার হার বেড়েছে ৫০ শতাংশ।
সাম্প্রতিক এই হামলাও প্রদেশটিতে সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
টিটিপি ও আফগানিস্তান প্রসঙ্গ
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগান তালেবান থেকে পৃথক একটি সংগঠন হলেও তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও আদর্শিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান টিটিপির তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, টিটিপির সদস্যরা আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালায়। তবে আফগান তালেবান সরকার এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ডেরা ইসমাইল খান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরও ওই অঞ্চলে টিটিপি-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
হামলার পর ডেরা ইসমাইল খানসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
সূত্র: ডন, আল জাজিরা
এফএ