আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১১ পিএম
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেও বেইজিংয়ের সব প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
শির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমানো। চীনের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র চীনের পরাশক্তি হয়ে ওঠার পথ ঠেকাতে চাইছে। তাই ওয়াশিংটনকে এসব ক্ষেত্রে চীনের জন্য আরও জায়গা করে দিতে রাজি করানো বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
তবে বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধের সাময়িক বিরতির মেয়াদ নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র কয়েক মাস বাড়ানো হয়েছে। বেইজিং অন্তত এক বছরের জন্য এই সমঝোতা বহাল রাখার আশা করেছিল। শির লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাকি সময়টা এ সমঝোতার মধ্য দিয়ে পার করা।
এর ফলে শুল্ক, বিরল খনিজ সরবরাহে চীনের আধিপত্য এবং উন্নত মার্কিন চিপে চীনের প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ আবারও আলোচনার টেবিলে থাকছে। দীর্ঘমেয়াদি ছাড় দেওয়ার আগে চীনের কাছ থেকে আরও কিছু পদক্ষেপ চাইছে ওয়াশিংটন—এ সিদ্ধান্তে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থনীতিতে চাপ
শির জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও বড় চ্যালেঞ্জ। চীন বিশ্ববাজারে রেকর্ড পরিমাণ পণ্য বিক্রি করলেও দেশের ভেতরে ভোক্তাদের ব্যয় কমেছে। তরুণদের বেকারত্বও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে আবাসন খাতের দাম কমেছে। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের নিজস্ব বাড়ি থাকায় এ পরিস্থিতির প্রভাবও উল্লেখযোগ্য।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রপ্তানি চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে বড় ধরনের শুল্ক আরোপ ঠেকানো শির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাইওয়ান নিয়ে মতবিরোধ
তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রয়কে আবারও চীনের জন্য রেড লাইন হিসেবে তুলে ধরেছেন শি।
আইন অনুযায়ী, স্বশাসিত দ্বীপটির আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে হয়। গত মে মাসে শি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে ভুল পদক্ষেপ দুই দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এরপর তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন স্থগিত করেন ট্রাম্প। তিনি এটিকে চীনের সঙ্গে আলোচনার একটি ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
বৈঠকে শি সম্ভবত যুক্তি দিয়েছেন, তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন সমর্থন সীমিত করলে সংঘাতের ঝুঁকি কমবে। বৃহস্পতিবারও তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে সঠিক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
তবে তাইওয়ানকে সমর্থন অব্যাহত রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিদলীয় চাপের মুখে থাকা ট্রাম্প শির বক্তব্যের বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
এআই নিয়েও আলোচনা
দুই নেতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও আলোচনা করেছেন। তবে এ প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলায় কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তারা একমত হয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
শি বলেছেন, এআই যেন সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে এ বিষয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
সম্প্রতি এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই। প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষ নিরাপত্তা গবেষকও সতর্ক করে বলেছেন, এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কা ১০ শতাংশের বেশি। তবে ট্রাম্প প্রযুক্তিটির কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কাকে ভাঁওতা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ফিরছে পাণ্ডা কূটনীতি
বৈঠকে চীনের বহুল পরিচিত পাণ্ডা কূটনীতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। আটলান্টায় পাঠানোর জন্য পিং পিং ও ফু শুয়াং নামের দুটি পাণ্ডা কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন শি।
শুক্রবার দুই নেতার চা পান এবং জাতীয় আর্কাইভ পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে। ফলে আরও কিছু ঘোষণা আসতে পারে।
দৃশ্যমান সাফল্য শির
তবে এ সম্মেলনে বেইজিংয়ের অন্যতম বড় সাফল্য হতে পারে আয়োজনের দৃশ্যমান দিকটি।
বিমানবন্দরে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা এবং জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ভোজ চীনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। এতে দেশের মানুষের কাছে শিকে ট্রাম্পের সমকক্ষ নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই নেতাকে তুলনা করে বিভিন্ন মিমও ছড়িয়েছে। এর মধ্যে একটি ছবিতে ট্রাম্পকে অস্বস্তিতে এবং শিকে নির্বিকার অবস্থায় দেখানো হয়েছে।
ট্রাম্প শির সঙ্গে সত্যিকারের মহান বন্ধুত্বের কথা বললেও চীনা প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য আরও বড়—যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের অবস্থান নিশ্চিত করা।
পাণ্ডা, জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ও উষ্ণ বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে কিছুটা সহজ করতে পারে। তবে এই আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে বিশ্বের দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা এখনো তীব্র।
এআর