আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে গমের সরবরাহে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারেও গম ও গমের আটার দাম বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চার বছর পর আবারও ভারতের কাছ থেকে বড় পরিমাণে গম আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ।
বুধবার (২৪ সেপ্টম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, গত আগস্টে ভারত গম রফতনির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করায় বাংলাদেশি আমদানিকারকেরা সম্প্রতি ভারতের কাছ থেকে ২ লাখ টনের বেশি গম কেনার জন্য ঋণপত্র (এলসি) বুকিং করেছেন। ২০২২ সালের পর এটিই ভারত থেকে বাংলাদেশের প্রথম গম আমদানি হতে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব গম মূলত রেলপথে বাংলাদেশে আসবে এবং বাংলাদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ প্রতি টন গমের দাম পড়বে আনুমানিক ৩০৫ থেকে ৩২৬ ডলার। সে হিসেবে প্রতি কেজি ভারতীয় গমের আমদানি মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫২ টাকা থেকে ৪০ দশমিক ১০ টাকা।
বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১০ লাখ টন গম উৎপাদন করে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত ৭০ লক্ষ টন গম আমদানি করতে হয়, যার বড় একটি অংশ আসত ভারত থেকে। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ শুরু হলে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য গম রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে ভারত।
এতে বাংলাদেশ আর্জেন্টিনা, কানাডা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মতো দেশ থেকে আমদানি করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের আমদানি করা গমের প্রায় ৪০ শতাংশই পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসতে থাকে।
বর্তমানে সেই সরবরাহব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বন্দরগুলোতে হামলার কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও গমের চাহিদা বেড়েছে। গত এক মাসে ঢাকায় পরিশোধিত গমের আটার দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে চালের দামও উচ্চ পর্যায়ে থাকায় ভোক্তাদের একটি অংশ চালের পরিবর্তে গমের দিকে ঝুঁকছে।
অন্যদিকে আগস্টে ভারত চার বছর ধরে চলা গম রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এর অন্যতম কারণ হলো ২০২৫-২৬ শস্য বছরে রেকর্ড ১২০ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন টন গম উৎপাদন হওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে গমের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
এতে একদিকে যেমন সরকারি গুদামগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত গম জমা হয়, অন্যদিকে খোলা বাজারে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকেরা তাদের উৎপাদন খরচ তুলতে পারছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে গম চাষিদের আর্থিক বিপর্যয় ঠেকাতে এবং উদ্বৃত্ত গম কাজে লাগাতে ভারত সরকার চার বছর পর রফতানি উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের বিপুল মজুত ও ভৌগোলিক নৈকট্য বাংলাদেশের জন্য বিকল্প সরবরাহের সুযোগ তৈরি করেছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার তাসলিম শাহরিয়ারের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ান গম, যার দাম আগে প্রতি টন ৩৮০ ডলারেরও কম ছিল, এখন বাংলাদেশী আমদানিকারকদের জন্য প্রতি টন ৪৮০ ডলার পড়ছে। এর ফলে গত এক মাসে ঢাকায় পরিশোধিত আটার দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
এইখানেই ভারতীয় গমের ভূমিকা আসে। ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে পণ্য পরিবহনের সময় কম লাগে এবং পরিবহনের খরচও কম হয়। সমুদ্রপথে গম আমদানিতে যেখানে ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে, সেখানে ভারতের রেলের মাধ্যমে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশে গম নিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে। এটি আমদানিকারকদের জন্য বড় ধরণের আর্থিক সাশ্রয় এনে দিয়েছে।
ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, শুধু বাংলাদেশই ভারতীয় গম কিনছে না। শ্রীলঙ্কার আমদানিকারকরাও সম্প্রতি ভারত থেকে প্রতি টন প্রায় ৩২৫ ডলার দরে প্রায় ৬০ হাজার টন গম কিনেছেন।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
এমএইচআর