আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্প্রতি সংঘাত তীব্র হওয়ার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি শিল্পে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, যার বড় প্রভাব পড়েছে তেলের দামে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আবারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে।
বেশিরভাগ দেশেই পেট্রোল ও ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে ঘরবাড়ি উষ্ণ রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইকারি দাম জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে আবারও মূল্যস্ফীতির বড় ধাক্কা সৃষ্টি করার আশঙ্কা বাড়ছে। এর ফলে সুদের হার বাড়তে পারে, সঙ্গে বাড়তে পারে খাবারসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম।
সর্বশেষ এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কী কী বিষয় কাজ কাজ করেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব কী হতে পারে?
বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের বেশি। গত জুন মাসেও এই দাম ছিল ৭০ ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে দাম।
এর প্রভাবে যুক্তরাজ্যে পেট্রোলের গড় দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে (লিটারে ১৭০ পেন্স) এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির এক গ্যালন বা ৩ দশমিক ৮ লিটার পেট্রোলের দাম জুলাইয়ের ৩ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে বেড়ে ৪ ডলার ৩২ সেন্ট হয়েছে (এএএ গ্যাস প্রাইসেস সূচক)।
ডিজেলের দামও রেকর্ড গড়ে প্রতি গ্যালনে ৬ ডলারের বেশি হয়েছে, যা ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা চালানোর পরের দামের চেয়েও বেশি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দাম বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ যাতায়াত করত।
পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা এই সরু জলপথটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যপথ।
ফেব্রুয়ারির পর ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে এই জ্বালানি প্রবাহ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির পরিবর্তে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে তেল রফতানির জন্য তাদের পূর্ব-পশ্চিম বরাবর ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ এর ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এই পাইপলাইনের দৈনিক ৩৬ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে।
কিন্তু গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিতে হয়। সৌদি আরব এই হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত ইরাকের মিলিশিয়াদের দায়ী করে।
এর পাশাপাশি গত সপ্তাহে হুথিরা সৌদি আরবের কয়েকটি তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
চ্যাথাম হাউসের নিল কুইলিয়াম বলেছেন, মেরামতের জন্য পাইপলাইনটি আট সপ্তাহ পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট মঙ্গলবার সিএনবিসিকে বলেছেন, এটি খুব দ্রুতই পুনরায় চালু হবে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগের সময়ের কাছাকাছি পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন অব্যহত রয়েছে। তবে বেশিরভাগ বিশ্লেষকদের মতে, জলপথটি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত অবস্থাতেই রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
কিন্তু কেপলারের হিসাবে, অগাস্টের শেষ নাগাদ এই পরিমাণ কমে দৈনিক প্রায় ৮৬ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।
গত দুই সপ্তাহে ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি সৌদি-সমর্থিত সরকারপন্থি বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগত কিছু এলাকা দখল করে নিয়েছে।
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই প্রণালিটি বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পথ, যা দিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসের আগে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ শতাংশ পরিবাহিত হতো।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের আরও প্রায় পাঁচ শতাংশ সাধারণত লোহিত সাগরের উত্তর দিক দিয়ে সুয়েজ খাল এবং মিসরের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে যায়।
হরমুজ প্রণালির মতোই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোও ইরান ও তাদের মিত্রগোষ্ঠীর বা প্রক্সিদের দ্বারা আরও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে, এমন আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে।
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার আগে, জুলাইয়ে গোষ্ঠীটি ঘোষণা করেছিল যে তারা সৌদি জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। তারা বলেছিল, লোহিত সাগর দিয়ে যাওয়া অন্য দেশের জাহাজে তারা হামলা চালাবে না।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘বিশ্বজুড়ে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান নয়।’
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের ড্রোন হামলাসহ এই সংঘাত ডিজেলের দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে। কারণ রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিজেল রফতানিকারক দেশ।
তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া আঞ্চলিক সংঘাত।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য যদি অব্যহত থাকে তখন সাধারণত মানুষের জন্য বড় প্রভাব সৃষ্টি হয় নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। একই সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে যায়। এর ফলে মানুষের আয় ও মজুরি কমে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে ১০ শতাংশ বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ০.৪ শতাংশ বাড়ে এবং বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ০.২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতির হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ে এবং দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে।
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব মূল্যায়নের জন্য আইএমএফ ও ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড তাদের অর্থনৈতিক মডেলে যে পরিস্থিতি বা 'সিনারিও' বিবেচনা করেছিল, তার তুলনায় জুন মাস থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির হার প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যেমন ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরুর পর এক পর্যায়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। জুন মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি হওয়ার পর তেলের দাম সাময়িকভাবে দ্রুত কমে যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে চলে এসেছিল।—বিবিসি বাংলা
এমএইচআর