আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
একটি ভিডিওতে ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ ও ‘জাজাকাল্লাহ’ শব্দ ব্যবহারের কারণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ কর্মকর্তা (আইপিএস) ড. বুশরা বানুকে তার পদ থেকে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বিতর্কের বাইরে নতুন করে সামনে এসেছে তার ব্যক্তিগত জীবন, দীর্ঘ শিক্ষা, চাকরি, সংসার, মাতৃত্ব এবং একাধিকবার কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্যের গল্প।
উত্তরপ্রদেশের কানৌজে জন্ম বুশরা বানুর। পড়াশোনায় শুরু থেকেই ছিলেন মেধাবী। তিনি গণিতে স্নাতক ও এমবিএ করার পর আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে (এএমইউ) ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পিএইচডি করেন এবং গবেষণার সময় জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপও অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতাও করেছেন।
বিয়ের পর তার জীবনের আরেকটি অধ্যায় শুরু হয় সৌদি আরবে। তার স্বামী আসমার হুসেন জাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করতেন। বুশরাও সেখানে শিক্ষকতা করেন।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদিতে তার মাসিক আয় ছিল প্রায় আড়াই লাখ রুপি। কিন্তু বিদেশে প্রতিষ্ঠিত পেশাগত জীবন থাকা সত্ত্বেও তিনি ভারতে ফিরে এসে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর শুরু হয় তার ইউপিএসসি-যাত্রা। প্রথমবারের সাফল্যে ২০১৮ সালে অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক ২৭৭ অর্জন করেন এবং ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্রাফিক সার্ভিসে সুযোগ পান। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি। পরে আবার ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসেন এবং দ্বিতীয়বার ২৩৪ র্যাঙ্ক অর্জন করে ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসে (আইপিএস) নির্বাচিত হন।
এই পথচলায় সংসার ও মাতৃত্বও ছিল বড় দায়িত্ব। দ্বিতীয় সন্তানের সময় গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়েও তিনি ইউপিএসসির সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েছিলেন।
তার জীবনের এই অধ্যায়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে, কারণ একই সময়ে তাকে সন্তান, পরিবার ও ক্যারারের দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে। একাধিক প্রতিবেদনে তার বিভিন্ন শারীরিক অস্ত্রোপচারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বুশরা বানুর স্বামীও তার ক্যারিয়ার গড়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূলত, ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে গত ১৩ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন বুশরা। ভিডিওটিতে তিনি তার প্রস্তুতির দিনগুলোর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।
বুশরা জানান, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক কোচিং একাডেমি তাকে ইউপিএসসির জন্য প্রস্তুতি নিতে অনেক সাহায্য করেছিল।
ভিডিওতে পুলিশের পোশাক পরিহিতা বুশরা বানুর কথার মাঝে ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ এবং ‘জাযাকাল্লাহ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। আর এই নিয়েই বিতর্কের শুরু।
‘হিন্দু লিগাল ফান্ড’ নামের একটি ডানপন্থি সংগঠন বুশরা বানোর ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করে, এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
সংগঠনটি বক্তব্য, ভারতের রাজ্যের প্রতিনিধিত্বকারী একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে অবশ্যই নিরপেক্ষতা বজায় রাখা উচিত। বুশরা বানুর ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘জয় হিন্দ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা উচিত ছিল।
এদিকে ভিডিওটি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বুশরা বানুকে বদলির বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজ্য প্রশাসন।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, বুশরা বানুকে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের ডেপুটি কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। আর তার জায়গায় দায়িত্বে এসেছেন পার্থ ঘোষ। তিনি এখন খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কাজ করবেন।
তবে বিজ্ঞপ্তিতে বুশরা বানুর বদলির বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
একদিকে যেমন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সামাজিক মাধ্যমে বুশরা বানুর বক্তৃতা নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করছে, অন্যদিকে অনলাইনে একাধিক মুসলিম গোষ্ঠী তার বদিলি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে বুশরা বানুর ভাইরাল ভিডিওর পাশাপাশি এখন অন্যান্য রাজ্যের একাধিক পুলিশ অফিসারদের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে যেখানে ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় তাদের পূজার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। সেগুলো নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক।
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী বিধায়ক ও ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে বিজেপি সরকার এক দিকে মুসলিম নারীদের অধিকারের কথা বলছে, অন্যদিকে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের দোহাই দিয়ে একজন ‘শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত সম্মানের সঙ্গে চাকরি করছেন’ এমন মুসলিম নারীর অন্যায়ভাবে বদলি করছে।
তিনি বলেন, ‘বুশরা শুধু তিনটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যে শব্দে অন্য কোনো ধর্মের মানুষের আঘাত লাগবে না, যে শব্দ দেশবিরোধী নয়।’
রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম বা মিম) -এর মুখপাত্র এবং সাবেক বিধায়ক ওয়ারিশ পাঠান সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলছেন, ‘উনি একজন মুসলিম আইপিএস অফিসার বলে, একজন নারী বলে, আপনারা ওনাকে বদলি করে দিয়েছেন?’
তিনি আরও বলছেন, ‘আমরা দেখেছি ইউনিফর্ম পরে কত ব্যক্তি পুজো-আরতি করেছেন। কতজনকে দেখা গেছে ইউনিফর্ম পরে কাঁওয়াড়িয়াদের উপর ফুলবৃষ্টির আয়োজন করতে। তখন কারো আপত্তি হয়নি?’
তার দাবি, ভারতের সংবিধানে মানুষের যেমন ‘জয় হিন্দ’ বলার অধিকার আছে, তেমনই ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলার অধিকার আছে।
এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘একদিকে ব্রিকস সম্মেলনে প্রার্থনা কক্ষ তৈরি করে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তুলে ধরছে বিজেপি সরকার; অন্যদিকে, কেবল আসসালামু আলাইকুম ও জাযাকাল্লাহ বলার কারণে মুসলিম নারী আইপিএস অফিসার ড. বুশরা বানোকে কোণঠাসা করা হচ্ছে - যা ‘গোদি মিডিয়া’র ছড়ানো বিদ্বেষকেই আরও উসকে দিচ্ছে।’
সূত্র: আজতক, বেটার ইন্ডিয়া
এমএইচআর