আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জেলায় মধ্যরাতে বাড়ি থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজ্য পুলিশের বিরুদ্ধে। আটককৃতদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল.ইন-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত জুন থেকে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে অন্তত নয়জন মুসলিম পুরুষ ও দুই শিশুকে একইভাবে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা। এসব আটকের ক্ষেত্রে একই ধরনের একটি পদ্ধতি দেখা গেছে। অনেককে গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, আটককৃত ব্যক্তিদের কাছে ভারতের বৈধ ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন সনদ, জমির দলিল কিংবা পেনশনের খাতা রয়েছে। এমনকি কেউ কেউ সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটও দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়েই ধরে নিয়ে গেছে। এমনকি পুলিশের কাছে গ্রেফতারি পরোয়ানা, এফআইআর বা আদালতের রিমান্ড সংক্রান্ত নথি ছিল না।
প্রতিবেদনে মুর্শিদাবাদের রামকান্তপুর গ্রামের ৬১ বছর বয়সী ইব্রাহিম শেখের ঘটনা তুলে ধরেছে স্ক্রল.ইন।
ইব্রাহিম শেখের পরিবারের দাবি, গত ২৯ জুলাই রাতে সাদা পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি তাদের বাড়িতে গিয়ে ইব্রাহিমের পরিচয়পত্র দেখতে চান। তিনি আধার ও ভোটার কার্ড দেখানোর পরও তাকে বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যরা পরে পুলিশকে পেনশন সংক্রান্ত নথি, জমির দলিল ও ভোটার কার্ডসহ বিভিন্ন কাগজপত্র দেখালেও ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে পুলিশ জানায়, তাকে একটি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে।
ইব্রাহিম শেখের পুত্রবধূ পারভিন খাতুন বলেন, রাত সাড়ে ১২টার তাদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে একদল লোক। ৬১ বছর বয়সি ইব্রাহিম শেখ দরজা খুলতেই সাত-আটজনের একটি দল তাকে ঘিরে ধরে। লোকগুলো সাধারণ পোশাকে থাকলেও তাদের দেখে পুলিশ কর্মকর্তা বলেই মনে হচ্ছিল।
পারবিন বলেন, ‘তারা ইব্রাহিম শেখের কাছে কাগজপত্র দেখতে চায়। তখন তিনি তাদের তার আধার ও ভোটার কার্ড দেখান। এরপর তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি ইন্ডিয়ান, না বাংলাদেশি?’
জবাবে ইব্রাহিম বলেন, ‘তিনি ভারতীয়, বাংলাদেশি নন’। কিন্তু লোকগুলো জানায়, তাদের কাছে তথ্য আছে তিনি ভারতীয় নাগরিক নন। এরপরই তারা ইব্রাহিমের দুই হাত পেছনে চেপে ধরে যখন শারীরিকভাবে হেনস্তা করতে শুরু করে, তখন তিনি 'প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যান' এবং 'পুলিশ যা বলছিল তার সবকিছুতেই ‘হ্যাঁ’ বলতে থাকেন।
এরপর লোকগুলো ইব্রাহিমকে বাংলাদেশি নাগরিক আখ্যা দিয়ে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। পরে জানা যায় তারা সুতিপুর থানা পুলিশ ছিলেন।
এদিকে ইব্রাহিম শেখ একা নন। একইভাবে উত্তর দিনাজপুরের জলিল আখতারের ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার পরিবারের দাবি, গত ১৯ জুন মধ্যরাতে উত্তর দিনাজপুর জেলার বাহরাই গ্রামে নিজ বাড়ির বারান্দায় ঘুমাচ্ছিলেন ৬৭ বছর বয়সি জলিল আক্তার। ঠিক তখনই পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে পুলিশ তাকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করে।

তার স্ত্রী তৌফা বিবি বলেন, ‘পুলিশ রাতে চোরের মতো এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখতে না পেয়ে তখন ভেবেছিলাম হয়তো ফজরের নামাজ পড়তে গেছেন। কিন্তু তিনি যখন আর ফিরলেন না, তখন আমরা খুব সকালেই তাকে খুঁজতে বের হই।’
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ৪ জুলাই তাকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে দেওয়া হলেও তিনি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করায় বিএসএফ তাকে পুলিশের কাছে ফেরত দেয়। এরপর তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ‘অভিবাসন ও বিদেশী আইন ’-এর অধীনে মামলা করা হয়।
আরেকটি ঘটনায় আবদুল জব্বার ও তার দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে আটকের অভিযোগ করেছে পরিবার।
প্রতিবেদনের বলা হয়, ইব্রাহিম শেখকে তুলে নেওয়ার এগারো দিন পর, মধ্যরাতে সুতি থানার পুলিশ তিন কিলোমিটার দূরের নূরপুরদিয়া গ্রামের একটি বাড়িতে হাজির হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাত-আটজন পুলিশ সদস্য জামিরুল শেখের দরজায় কড়া নেয়ে তার দত্তক নেওয়া ছেলে আব্দুল জব্বারের খোঁজ করেন।
জমিরুল বলেন, ‘পুলিশ দাবি করেছে, ও বাংলাদেশি। এরপর ওকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি ২৬ বছর আগে জব্বারকে ওর নানা-নানির কাছ থেকে দত্তক নিয়েছিলাম।’
জব্বারের দুই ছেলে—আট বছর বয়সি আহাদ ও ছয় বছর বয়সি জিয়াদকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তার তৃতীয় সন্তান, ১১ মাস বয়সী আব্দুল হালিম তার স্ত্রীর কাছে রয়েছে।
জব্বারের পরিবারের দাবি, তার কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট, নূপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সাব-রেজিস্ট্রারের ইস্যু করা জন্মনিবন্ধন সনদ ও ভোটার কার্ডসহ কয়েকটি নথি রয়েছে। তিনি সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ভোটও দিয়েছেন। তবে এসব নথি মানতে নারাজ পুলিশ।
এদিকে আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা বিষয়টি আদালতে তুলেছেন। ইব্রাহিম শেখের পরিবার কলকাতা হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস আবেদন করেছে।
ইব্রাহিমের আইনজীবী মো. নূর হোসেন জমাদার স্ক্রলকে বলেন, হানিফা ছিলেন ইব্রাহিমের খালা। তিনি ইব্রাহিমকে তাকে দত্তক নিয়েছিলেন। 'তবুও এটি একটি বেআইনি আটক। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও, পরিবারের কাছে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। অ্যারেস্ট মেমো বা এফআইআর ছাড়া কাউকে এভাবে আটকে রাখা যায় না।'
অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
সুতির পুলিশ কর্মকর্তা অভিজিৎ বসু মল্লিক বলেছেন, ইব্রাহিম শেখকে সরকারের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী আটক করা হয়েছে এবং এ ধরনের আটকের জন্য এফআইআর প্রয়োজন নেই।
জঙ্গিপুরের পুলিশ সুপার সুরিন্দর সিংও বলেছেন, সবকিছু সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী করা হয়েছে এবং পরিবারগুলো জানে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশি।
প্রসঙ্গত, এর আগে কর্ণাটক, আসামসহ ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হেনস্থার শিকার হতে দেখা গেছে। তবে এবার নিজেদের রাজ্যেই বাংলাভাষী মুসলিমরা এমন আকস্মিক ও বেআইনি ধরপাকড়ের মুখোমুখি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
এমএইচআর