আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০২ পিএম
যুদ্ধবিমান ভূপাতিত, চারদিকে তল্লাশি— এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও গুরুতর আহত অবস্থায় প্রায় ৫০ ঘণ্টা ইরানি ভূখণ্ডে আত্মগোপন করে ছিলেন এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, ভাঙা পিঠ, হাত ও কাঁধ নিয়ে প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ইরানি বাহিনীর তীক্ষ্ম নজরদারি এড়িয়ে তিনি বেঁচে ফিরেছেন।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন তিনি। নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। সামরিক মিশনে তাকে ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে চিহ্নিত করা হয়। তার সঙ্গে থাকা পাইলটকে বলা হয় ‘আলফা’।
সিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২ এপ্রিল ইরানের একটি পাহাড়ি এলাকার কাছে মিশন পরিচালনার সময় তাদের এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ইরানের একটি কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর দুজনই বিমান থেকে বেরিয়ে প্যারাসুটে করে নিচে নামেন। ‘আলফা’ তুলনামূলক নিরাপদে অবতরণ করেন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন বাহিনী তাকে উদ্ধার করে।
কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত প্যারাসুটের কারণে ‘ব্রাভো’ প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়েন। মাটিতে আছড়ে পড়ার সময় তার পিঠ, একটি হাত ও কাঁধের হাড় ভেঙে যায়। মাথা ও মুখেও গুরুতর আঘাত লাগে।
আহত অবস্থায় চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সেখান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একটি উপত্যকায় আটকে পড়লেও তার কাছে মনে হয়, নিচে থাকার চেয়ে পাহাড়ের ওপরে ওঠাই নিরাপদ। এরপর প্রচণ্ড ব্যথা নিয়েই প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি রিজলাইনে উঠে যান তিনি। পরে একটি দুর্গম পাথুরে ফাঁকে আশ্রয় নিয়ে প্রায় দুই দিন ইরানি বাহিনীর কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন।
ব্রাভো বলেন, শরীরে গুরুতর আঘাত থাকলেও সামরিক প্রশিক্ষণ আমাকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কাও ছিল। তবে আমি কোনোভাবেই নিজেকে ইরানের টেলিভিশনে দেখতে চাইনি।
তাকে উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। শতাধিক মার্কিন সেনা ও বিপুলসংখ্যক সহায়ক সদস্য এই অভিযানে যুক্ত ছিলেন।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পর দুই মার্কিন কর্মকর্তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র। শুরু হয় বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান। পাইলটকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ব্রাভোর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবি, ব্রাভোকে উদ্ধারে ইরানের মাটিতে ৯০ জনের বেশি মার্কিন সেনা প্রবেশ করে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। গত ৪৬ বছরের মধ্যে দেশটিতে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের এটিই ছিল প্রথম ঘটনা।
এদিকে শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন তিনি।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাকে খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা তথ্য, ড্রোন ও অন্যান্য প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়। পরে তার অবস্থানের কাছাকাছি অবস্থান করা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের লক্ষ্য করে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০ ঘণ্টা পর মার্কিন উদ্ধারকারী দল পাহাড়ি এলাকায় তার সন্ধান পায় এবং তাকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।
এদিকে উদ্ধার হওয়ার মুহূর্তকে জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন ‘ব্রাভো’। একই সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতাকে তিনি ‘আধুনিক যুগের এক অলৌকিক ঘটনা’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
সূত্র: এনডিটিভি
এমএইচআর