আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৭ এএম
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) তাদের প্রথম সড়ক সেতু উদ্বোধন করেছে। তুমেন নদীর ওপর নির্মিত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের এই সেতুকে দুই দেশই ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারত্বের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং বন্ধুত্বের নতুন প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।
উদ্বোধনের দিন পতাকাসজ্জিত প্রথম কয়েকটি ট্রাক সেতুটি পেরিয়ে যায়। এ সময় ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে বক্তব্য দেন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন ও উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাক থায়ে সং। খবর রয়টার্সের।
দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও নির্মাণকর্মীরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বহু বছর ধরে সেতুটি নির্মাণের আলোচনা চলছিল। ২০২৪ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফরের সময় প্রকল্পটি চূড়ান্ত হওয়ার পর গত বছরের এপ্রিলে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়।
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে এরই মধ্যে সরাসরি বিমান ও রেল যোগাযোগ রয়েছে। তবে সোমবারের আগে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
১৯৫৯ সাল থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় পাশের রেলসেতুর ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে যানবাহন পারাপার করা হতো। এতদিন এটিই ছিল দুই দেশের সীমান্ত পারাপারের একমাত্র পথ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মিশুস্তিন বলেন, সীমান্তবর্তী পরিবহন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ দুই দেশের বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতায় বড় ধরনের গতি আনবে।
তিনি রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ককে ‘অভূতপূর্ব উচ্চতায়’ পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করেন এবং সেতু উদ্বোধনকে ‘সত্যিকারের ঐতিহাসিক ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
মিশুস্তিন বলেন, এটি শুধু একটি প্রকৌশল প্রকল্প নয়, বরং দুই দেশের বন্ধুত্বের নতুন প্রতীক। রুশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে সর্বোচ্চ ৩০০টি যানবাহন চলাচল করতে পারবে।
সেতুটি রাশিয়ার ফেডারেল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং দেশটির সুদূর পূর্বাঞ্চলের শহর ভ্লাদিভস্তক থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত বিস্তৃত পরিবহন করিডরের সঙ্গে সহজ সংযোগ তৈরি করবে।
অবিলম্বে সেতুটি দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল শুরু হবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে এবং তখন যাত্রী পরিবহনও শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে রুশ সরকার।
নতুন সেতুটি ১৯৫৯ সালে চালু হওয়া পুরোনো ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’-এর কাছে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতীকীভাবে নতুন সেতুটির নাম রাখা হয়েছে ইয়াকভ নোভিচেঙ্কোর নামে।
উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে নোভিচেঙ্কোকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করা হয়। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, ১৯৪৬ সালে দেশটির প্রথম নেতা কিম ইল সুংকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি গ্রেনেড নিজের শরীর দিয়ে ঠেকিয়ে তার জীবন রক্ষা করেছিলেন এই রেড আর্মি সেনা।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ জানিয়েছে, নতুন সেতুটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, পর্যটন এবং পণ্য বাণিজ্যও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২০২৪ সালে ইউক্রেনীয় বাহিনীর কুর্স্ক অঞ্চলে অভিযানের সময় রাশিয়াকে সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়া হাজার হাজার সেনা পাঠায়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মিশুস্তিনও বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেন। তিনি সম্প্রতি রুশ সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রুশ ভূখণ্ড রক্ষায় লড়াই করা ‘কোরীয় বীরদের’ প্রশংসা করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম উল-চুলের মতে, নতুন সেতুটি উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোর কার্যকারিতা কমে যাওয়ার বিষয়টিই তুলে ধরছে।
তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়া নিজেদের স্বার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে রাশিয়া এই সেতুর মাধ্যমে সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও জনবল—যার মধ্যে সেনাসদস্যও রয়েছে—পরিবহনের জন্য একটি সরাসরি সড়কপথ পেয়েছে।
ইউক্রেনে চলমান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই যোগাযোগব্যবস্থা রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
-এমএমএস