আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম
নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৩৭৫ জনে। শনিবার দুই দেশের সরকারি হিসাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এই দৈব-দুর্বিপাকের ১০ দিন পরও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত পাঁচ হাজার ৫৩১ জন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮৫০ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপালে মৃতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৩৪৪ জন। দেশটিতে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৩১ জন।
নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্ত করতে দুই হাজার ২৩২টি ডিএনএ নমুনা ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে।
যেভাবে শুরু হয় দুর্যোগ
গত ২৬ আগস্ট মাউন্ট লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর ঢালে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় বরফ ও পাথরের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে ভয়াবহ তুষার-পাথরের ধস নামে।
পরে সেই ধসের বরফের স্তূপ, পাথর, কাদা ও পানির সমারোহে ভয়াবহ গতির স্রোতে রূপান্তরিত হয়। স্রোতটি নেপাল-চীন সীমান্তের লেহেন্দে খোলা উপত্যকা দিয়ে তীব্রবেগে নেমে আসে।
এরপর তা চীনের তিব্বতের গিয়িরং সীমান্ত এলাকা হয়ে নেপালের ত্রিশূলী নদীতে পৌঁছে যায়। পথে বহু শহর ও গ্রাম বিশাল উচ্চতার ঢেউ দিয়ে প্লাবিত হয়ে যায়।
ধসের কারণে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে কয়েকটি প্রাকৃতিক বাঁধ ও জলাধার তৈরি হয়। পরে সেগুলো ভেঙে বা উপচে পড়ায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বন্যা।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
বন্যায় নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও কাভ্রে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কাঠমান্ডু উপত্যকা ও আশপাশের এলাকাতেও।
অনেক গ্রাম মাটিচাপা পড়েছে বা পানির স্রোতে ভেসে গেছে। ধ্বংস হয়েছে বহু ঘরবাড়ি, স্কুল, সেতু ও সড়ক। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
ত্রিশূলী ও ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুর্যোগে বিভিন্ন স্থাপনায় শত শত শ্রমিক আটকা পড়েন। তাদের উদ্ধারে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানো হয়েছে।
নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা কয়েকজনকে দুর্যোগের এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যার স্রোতে মরদেহ ও ধ্বংসাবশেষ বহু দূর পর্যন্ত ভেসে গেছে। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরে কিছু মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এতে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনের গিয়িরং সীমান্ত চৌকিও কাদা ও ধ্বংসাবশেষে প্রায় চাপা পড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবন, যানবাহন ও অন্যান্য স্থাপনা।
চলছে উদ্ধার অভিযান
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। চীনা উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে।
বিধ্বস্ত এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়ক পরিষ্কার ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
তবে টানা বৃষ্টি, ভূমিধসের ঝুঁকি, দুর্গম ভূখণ্ড ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘ ও সহযোগী মানবিক সংস্থাগুলো নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা দিতে ৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের তহবিল চেয়েছে।
মানবিক সংস্থাগুলোর হিসাবে, এই দুর্যোগে নেপালে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
প্রাথমিক হিসাবে নেপালে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩৮৭ বিলিয়ন নেপালি রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয়ের দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠার মতো জলবায়ু ঝুঁকিও এই দুর্যোগে প্রকটরূপে পরিলক্ষিত হয়েছে।
বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়ার কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় ভূমির স্থিতিশীলতাও কমতে পারে। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তবে লাংটাং লিরুংয়ের ঢাল ধসে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করতে এখনো অনুসন্ধান চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সূত্রপাত হতে পারে। বরফ ও পাথরের ধস থেকে তৈরি হতে পারে কাদার স্রোত। তা নদীর প্রবাহ বন্ধ করে তৈরি করতে পারে অস্থায়ী জলাধার। পরে সেই বাঁধ ভেঙে নেমে আসতে পারে দুকূল ছাপিয়ে ভয়াবহ বন্যা।
শনিবারও দুই দেশের উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধান, মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে এটিকে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: ডেইলি সাবাহ, কাতার নিউজ এজেন্সি
এফএ