আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম
ভারতের উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে রাতের অন্ধকারে প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে সাহারানপুর কালেক্টরেটের ভেতরে অবস্থিত ‘গরিব নওয়াজ আল মারুফ’ নামে মসজিদটি গুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই উচ্ছেদ অভিযানের সময় বিপুলসংখ্যক পুলিশ, প্রাদেশিক সশস্ত্র কনস্ট্যাবুলারি—পিএসি এবং অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। কালেক্টরেট চত্বরের প্রবেশপথও নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
প্রশাসনের বক্তব্য, মসজিদটি সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল। বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ৩১৫ বর্গমিটার জমি, যা রাজস্ব নথিতে কালেক্টরেটের সরকারি সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত বলে আদালতে জানানো হয়।
২০২৫ সালে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বজরং দল’-এর সাবেক এক নেতা অভিযোগ করেন, কালেক্টরেট চত্বরে সরকারি জমি দখল করে ধর্মীয় স্থাপনা তৈরি ও ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে রাজস্ব বিভাগ তদন্ত শুরু করে এবং গত মার্চ মাসে এই আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
পরবর্তীতে জুলাই মাসে সিটি ম্যাজিস্ট্রেট মসজিদটিকে ‘অনুমোদনহীন স্থাপনা’ আখ্যা দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে তা খালি করার নির্দেশ দেন।
তবে মসজিদ পরিচালনা কমিটির দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, মসজিদটি বহু পুরোনো—প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে রয়েছে এবং জমির মালিকানা নিয়ে তাদের পক্ষে নথিও রয়েছে। তারা সরকারি পক্ষের জমির মালিকানা দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে।
মসজিদের মুতাওয়াল্লি (তত্ত্বাবধায়ক) তানভীর আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মসজিদটি ব্রিটিশ আমল থেকে, অর্থাৎ প্রায় ১৫০ বছর ধরে সেখানে রয়েছে। ঐতিহাসিক নথিতে ১৯১১ সালে এই মসজিদে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার প্রমাণও রয়েছে, যা কালেক্টরেট ভবন তৈরিরও আগের।
গত ১৬ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত মসজিদটিকে ‘অননুমোদিত স্থাপনা’ হিসেবে বিবেচনা করে উত্তরপ্রদেশ পাবলিক প্রিমাইসেস (অননুমোদিত দখলদার উচ্ছেদ) আইন, ১৯৭২-এর আওতায় উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে প্রায় ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের কথাও বলা হয়।
মসজিদ পরিচালনা কমিটি এই নির্দেশের বিরুদ্ধে জেলা আদালতে আপিল করেছিল।
গত ২ সেপ্টেম্বর জেলা আদালত সেই আপিল খারিজ করে সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আগের আদেশ বহাল রাখে। তবে আদালতের আদেশে সরাসরি মসজিদ ভেঙে ফেলার নির্দেশ ছিল না; সেখানে আগের উচ্ছেদ-সংক্রান্ত আদেশই বহাল রাখা হয়।
আদালত সেই আপিল খারিজ করে দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভোরের আলো ফোটার আগেই মসজিদটি ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন।
ঘটনার পর সরব হয়ে বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে, আদালতের রায়ে সরাসরি মসজিদ ভাঙার নির্দেশ না থাকলেও তড়িঘড়ি করে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
সাহারানপুরের কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদ দিনটিকে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেছেন, এই পদক্ষেপে সংবিধান ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বিষয়টি উচ্চ আদালত এবং প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত নেওয়ার কথা বলেছেন।
সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ইকরা হাসান অভিযোগ করেছেন, সাহারানপুর যাওয়ার পথে তাকে নিজ বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল। তার দাবি, মসজিদ নিয়ে উদ্বেগ জানাতে তিনি সেখানে যেতে চেয়েছিলেন।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন এবং উত্তরপ্রদেশে আর কোনো মসজিদকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে দ্রুত ভেঙে ফেলার প্রবণতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই ঘটনায় ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বক্তব্য, এটি ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; সরকারি জমিতে কোনো স্থাপনা আইনসম্মত কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। আদালতে আপিল খারিজ হওয়ার পর প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে বলেই দাবি দলটির।
এমএইচআর