আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু নদের পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই লাদাখে সিন্ধু নদে প্রথমবারের মতো পাথরের বাঁধ (রক চেক ড্যাম) নির্মাণ করেছে ভারত।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, লাদাখের লেহ জেলার উপশি এলাকায় সিন্ধু নদে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পুরো কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে প্রাকৃতিক বড় বড় পাথর বা বোল্ডার দিয়ে, এতে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে নদীর পানির স্তর প্রায় ১০ ফুট বেড়েছে এবং প্রায় ৪ কোটি লিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য স্থানীয় কৃষি ও পানির নিরাপত্তা জোরদার করা। লাদাখের দুর্গম অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই কৃষকরা পানির সংকটে ভুগছিলেন। বিশেষ করে বসন্তকালে নদীর পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে যেত যে পাম্পের মাধ্যমে পানি তুলে জমিতে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। এতে বহু কৃষিজমি অনাবাদি থাকত এবং কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তেন।
নতুন চেক ড্যাম থেকে পানি নেওয়া হচ্ছে ইগু-ফে সেচ খালের মাধ্যমে। এর ফলে আশপাশের শুকনো কৃষিজমিতে সেচের সুযোগ বাড়ছে। স্থানীয় কৃষকদের জন্য এটি শুধু পানি সরবরাহের নতুন ব্যবস্থা নয়, বরং কৃষিকাজকে টেকসই করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ভারত সম্প্রতি সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর লাদাখে এই প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্বও বেড়েছে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিজেদের জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে সিন্ধু নদের পানি ব্যবহারের অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ইন্ডিয়া টুডে আরও জানিয়েছে, লাদাখ প্রশাসন ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি চেক ড্যাম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের কাছে ৩৬টি চেক ড্যাম প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে লেহ অঞ্চলে সাতটি ‘হিমালয়ান রক চেক ড্যাম’ এবং কারগিল অঞ্চলে ২৯টি চেক ড্যাম বা উইয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬ কোটি রুপির বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, লাদাখের কৃষি ও পানির সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের ছোট আকারের পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পানির ব্যবহার ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রা এবং ভারতের কৌশলগত অবস্থান—দুই ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সিন্ধু নদে ভারতের নতুন চেক ড্যাম নির্মাণকে কেবল লাদাখের কৃষকদের সেচ সুবিধা বাড়ানোর প্রকল্প হিসেবে দেখবে না পাকিস্তান।
ইসলামাবাদের দৃষ্টিতে, উজানে ভারতের এ ধরনের পানি অবকাঠামো নির্মাণ ভবিষ্যতে পাকিস্তানের পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বলেছে, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর এবং দুই দেশের পানি-সংক্রান্ত বিরোধ চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই সমাধান করতে হবে।
এরমধ্যেই গত ১ সেপ্টেম্বর হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতও (পারমানেন্ট কোর্ট অব অরবিট্রেশন) চুক্তিটিকে বহাল এবং ভারতের একতরফাভাবে চুক্তিকে ‘স্থগিত’ করার অধিকার নেই বলে রায় দিয়েছে।
পাকিস্তান এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সমর্থন হিসেবে দেখছে। তবে ভারত এ রায়ে সন্তুষ্ট নয়।
রায় সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নয়াদিল্লির দাবি, এই সালিশি আদালতের ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর কোনো এখতিয়ারই নেই।
প্রসঙ্গত, সিন্ধু এবং তার উপনদীগুলোর পানি বণ্টনের জন্য বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী— সিন্ধু অববাহিকার রাভি (ইরাবতী), বিয়াস (বিপাশা) ও সুতলেজ (শতদ্রু) নদীর পানি ভারতের জন্য বরাদ্দ। আর সিন্ধু, ঝেলাম ও চেনাব নদীর ৮০ শতাংশ পানি পায় পাকিস্তান। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষিজমি এই সিন্ধু নদ এবং এর উপনদীগুলোর সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনার পরও টিকে ছিল। তবে চলতি বছরের গত ২২ এপ্রিল ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার পরেই পাকিস্তানকে দায়ী করে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে মোদি সরকার।
ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে মদত দেওয়া বন্ধ না করা পর্যন্ত এই চুক্তি স্থগিত থাকবে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, নিউজ১৮
এমএইচআর