আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২০ পিএম
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট বা হিমালয়ের হিমবাহ গলার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও ভূমিকা রাখছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পর্বতারোহী ও গাইডদের পোড়ানো জ্বালানির তাপ এবং সরাসরি হিমবাহে ত্যাগ করা মূত্র বরফ গলনের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি ‘রিজিওনাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’ নামক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি নেপালের এভারেস্টের অংশে অবস্থিত খুম্বু হিমবাহকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। এভারেস্টের নেপাল অংশে অবস্থিত বেজ ক্যাম্পটি এই হিমবাহের ওপরে অবস্থিত।
আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল তিনটি প্রধান কারণ খতিয়ে দেখেছেন, এর মধ্যে রয়েছে- বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং মানুষের মূত্র নিঃসরণ থেকে উৎপন্ন তাপ।
গবেষকদের হিসাবে, বসন্তের পর্বতারোহণ মৌসুমে বেস ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার লিটার মূত্র উৎপন্ন হয়। এর বড় একটি অংশ সরাসরি হিমবাহের ওপর ফেলা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া মূত্রের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিপুল পরিমাণ উষ্ণ মূত্র সরাসরি বরফের ওপর পড়ায় স্থানীয়ভাবে বরফ গলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, শুধু মানুষের মূত্রের কারণে প্রায় ১৫৪ টন বরফ ও তুষার গলে যাওয়ার অনুমান করেছেন গবেষকেরা।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, হিমবাহ গলার প্রধান কারণ মূত্র নয়। বেস ক্যাম্পে রান্না, তাঁবু গরম রাখা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির তাপও বড় ভূমিকা রাখছে।
গবেষকরা ২০২৩ সালের বসন্তকালীন পর্বতারোহণ মৌসুমে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করেন। তারা ক্যাম্পে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যকলাপের মাধ্যমে নির্গত শক্তি ও তাপ পরীক্ষা করে দেখেন। এর মধ্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, কেরোসিন এবং পেট্রোলের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই জ্বালানিগুলো রান্না, তাপ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো অপরিহার্য কাজে ব্যবহৃত হয়। গবেষকরা মূত্রত্যাগের ফলে উৎপন্ন তাপ নিয়েও গবেষণা করেছেন। বেস ক্যাম্পে মানুষের কার্যকলাপ কীভাবে খুম্বু হিমবাহকে প্রভাবিত করতে পারে, তা বোঝার জন্য এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে।
গবেষণা অনুসারে, ২০২৩ সালের বসন্ত মৌসুমে এই কার্যকলাপগুলো থেকে নির্গত মোট তাপশক্তির পরিমাণ আনুমানিক ৮৪৯,১৭৪ ± ১৭৯,৭৭৪ মেগাজুল ছিল। এটি একটি বিশাল পরিমাণ শক্তি। গবেষকরা হিসাব করে দেখেছেন যে, এই পরিমাণ তাপ প্রায় ২,৪৯২ ± ৫২৮ টন হিমবাহের বরফ ও তুষার গলানোর জন্য যথেষ্ট হবে।
গবেষকেরা আরও বলছেন, এভারেস্ট বেস ক্যাম্প এখন শুধু পর্বতারোহীদের অস্থায়ী অবস্থানস্থল নয়; এটি মৌসুমি একটি বড় বসতিতে পরিণত হয়েছে। ক্যাফে, গরম পানির ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য আধুনিক সুবিধার কারণে মানুষের পরিবেশগত প্রভাবও বেড়েছে। গবেষণার প্রধান লেখক খিম লাল গৌতমের মতে, হিমবাহের ওপর মানুষের এই চাপ ভবিষ্যতে টেকসই থাকবে না।
এই পরিস্থিতিতে গবেষকেরা এভারেস্ট বেস ক্যাম্পকে হিমবাহের ওপর থেকে সরিয়ে বরফমুক্ত স্থানে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং হিমবাহের ওপর সরাসরি মূত্রত্যাগ বন্ধ করাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা ঠিক হবে না। বৈশ্বিক উষ্ণায়নই হিমালয়ের হিমবাহ সংকুচিত হওয়ার মূল চালিকাশক্তি। মানুষের কর্মকাণ্ড সেই প্রক্রিয়াকে আরও প্রভাবিত করছে।
সূত্র: এনডিটিভি
এমএইচআর