আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম
সিন্ধু নদের পানি বণ্টন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধ এবার নতুন মোড় নিয়েছে। হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত- ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব অরবিট্রেশনের’-এর সিন্ধু পানি চুক্তি বহাল রাখার পক্ষে রায় দেওয়ার পর তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। নয়াদিল্লির দাবি, এই সালিশি আদালতের ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর কোনো এখতিয়ারই নেই।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দেওয়া এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হেগের সালিশি আদালতকে ‘অবৈধভাবে গঠিত’ বলে অভিহিত করে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে গঠিত এই আদালত সিন্ধু পানি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ভারত কখনোই এই সংস্থার অস্তিত্ব বা এখতিয়ার স্বীকার করেনি এবং আদালতের আগের কোনো সিদ্ধান্তও আমলে নেয়নি।’
নয়াদিল্লি আরও দাবি করেছে, এই আদালতের কোনো সিদ্ধান্তই ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত বা দেশটির চলমান জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে স্থগিত করা সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত অবস্থাতেই থাকবে।
এর আগে সোমবার হেগের আদালত জানায়, ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। চুক্তি স্থগিত রাখার জন্য ভারতের কাছে বৈধ কোনো কারণ নেই।
এছাড়াও চুক্তির অধীনে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনা ও নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও আদালত উল্লেখ করেছে।
কোর্ট অব অরবিট্রেশন আরও জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংক-নিযুক্ত একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে এসব প্রকল্প চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা মূল্যায়ন করবেন। রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল ও পানি প্রবেশ কাঠামোর নির্মাণ নিয়েও অন্তর্বর্তী বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সিন্ধু এবং তার উপনদীগুলোর পানি বণ্টনের জন্য বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী— সিন্ধু অববাহিকার রাভি (ইরাবতী), বিয়াস (বিপাশা) ও সুতলেজ (শতদ্রু) নদীর পানি ভারতের জন্য বরাদ্দ। আর সিন্ধু, ঝেলাম ও চেনাব নদীর ৮০ শতাংশ পানি পায় পাকিস্তান।
এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনার পরও টিকে ছিল। তবে চলতি বছরের গত ২২ এপ্রিল ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার পরেই পাকিস্তানকে দায়ী করে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে মোদি সরকার। ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে মদত দেওয়া বন্ধ না করা পর্যন্ত এই চুক্তি স্থগিত থাকবে। মে মাসে ভারত-পাক সংঘাত বন্ধ হলেও চুক্তি কিন্তু স্থগিতই রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথায়, ‘রক্ত ও একসঙ্গে বইতে পারে না।’
এদিকে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করার পর থেকে ভারত সরকারকে পর পর চার বার চিঠি দিয়েছে পাকিস্তান। পাক প্রধানমন্ত্রী শেহহবাজ শরিফ জানান, এই চুক্তির উপর ২৪ কোটি পাকিস্তানির জীবন নির্ভর করে আছে। তিনি দাবি করেন, ভারতের সিদ্ধান্ত বেআইনি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে সিন্ধু নদে ভারত বাঁধ নির্মাণ করলে তা মিসাইল মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ডমার্শাল অসীম মুনির।
তবে আদালতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে, এ রায় তার কার্যক্রমে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ফলে সিন্ধু নদীর পানি বণ্টনকে ঘিরে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পানি-রাজনীতির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া
এমএইচআর