আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩৩ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে ৭০০ জনই বিদেশি পর্যটক।
শনিবার (২৯ আগস্ট) এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৩৩ জনে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্টরা। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রশাসন।
স্বজনহারাদের কান্না আর বাড়তে থাকা লাশের মিছিল জানান দিচ্ছে প্রকৃতির কতটা ভয়ংকর আঘাত প্রত্যক্ষ করছে হিমালয় অঞ্চল। তবে বরফ আর পাহাড়ের এই তাণ্ডব মানব ইতিহাসে এবারই প্রথম নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী এমন বিধ্বংসী হিমবাহ বিপর্যয়ে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেছে পৃথিবীর অনেক জনপদ।
বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী কিছু হিমবাহ বিপর্যয়ের তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১৯৪১ — হুয়ারাজ, পেরু
১৯৪১ সালে উত্তর পেরুর আন্দিজ পর্বতে অবস্থিত একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। পানির তীব্র তোড়ে হুয়ারাজ শহরের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। এই ঘটনায় আনুমানিক ৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই দুর্যোগকে মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
১৯৬২ — রানরাহিরকা, পেরু
১৯৬২ সালে পেরুর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট হুয়াসকারান থেকে বিশালাকার বরফের চাঁই ভেঙে পড়ে। মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে ১ কোটি ঘনমিটার পাথর, বরফ ও তুষার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসে। এতে করে রানরাহিরকা গ্রাম এবং আশপাশের কয়েকটি বসতি ১২ মিটার গভীর কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়ে। এই বিপর্যয়ে প্রায় ৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
১৯৭০ — ইয়ুংগে, পেরু
রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে মাউন্ট হুয়াসকারানের উত্তর দিকের প্রাচীর ভেঙে পড়ে। বরফ আর পাথরের বিশালাকার স্তূপ ঘণ্টায় ৩৩৫ কিলোমিটার গতিতে নিচের ইয়ুংগে ও রানরাহিরকা শহরের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে করে পুরো এলাকা বিপুল পরিমাণ কাদার আস্তরণের নিচে চাপা পড়ে যায়।
এই হিমবাহ ধসের কারণে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ মারা যান। ভূমিকম্প ও বরফধস মিলিয়ে মোট প্রাণহানি সেই সময় ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
১৯৮১ — চিরেনমা কো, তিব্বত
১৯৮১ সালে চীন-নেপাল সীমান্ত থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে চিরেনমা কো নামের হিমবাহ হ্রদে পাহাড়ের বিশাল বরফখণ্ড ভেঙে পড়ে। হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিশাল ঢেউ সৃষ্টি হয়। প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার পানি, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ তীব্র বেগে নেপালের দিকে ধেয়ে আসে। এই দুর্যোগে নেপালে আনুমানিক ২০০ মানুষ নিহত হন। সেতু, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে প্রায় ৪০ লাখ ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
২০২১ — চামোলি, ভারত
ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নন্দা দেবীর কাছে রন্টি পিক থেকে বরফের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে। পাথর, ধুলাবালি ও বরফের বিধ্বংসী স্রোত উপত্যকার দেড় হাজার মিটার নিচে নেমে আসে। উত্তরাখণ্ড রাজ্যে তৈরি হওয়া আকস্মিক বন্যায় দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন। বহু গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায় এবং দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পানির তোড়ে ভেসে যায়।
২০২৬ — নেপাল-তিব্বত সীমান্ত
বুধবার (২৬ আগস্ট) হিমালয়ের একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে। এতে নেপাল ও তিব্বতজুড়ে এখ পর্যন্ত ৬৩৩ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। কাদামাটির তীব্র স্রোত তিব্বতের গিরোং বন্দরে আঘাত হানে এবং পরে তা নেপালের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে যায় এবং পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
এফএ