আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেফতার হন। এর পর থেকে দেশটির শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও অর্থনৈতিক সংকট এবং জীবনযাত্রার মান এখনো শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য অনিশ্চিত আয় ও আকাশছোঁয়া খাদ্যমূল্যই এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
রাজধানী কারাকাসের বাসিন্দা মারবেলিস দালিজ ও তার স্বামী আরলিন্দো দা সিলভা একটি মিষ্টান্নের দোকান চালান। অতিমুদ্রাস্ফীতি ও নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের ব্যবসার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
দালিজ বলেন, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ‘আমাদের অনেক প্রত্যাশা ও আনন্দ ছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাস্তবতা আমাদের সব আশা ভেঙে দিয়েছে।’
৫৪ বছর বয়সী এই মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক অল্প মুনাফায় কোনোরকমে টিকে আছেন। তবে ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন না জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আশা করি, একসময় এই পরিস্থিতি কেটে যাবে এবং আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াব।’
মূলত, মাদুরোর শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দল বা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে বর্তমানে সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা প্রকাশ্য রাজপথে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছে।
শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রাজনৈতিক বন্দিদের স্বজনরা এখন নিজেদের অধিকার আদায়ে নির্দ্বিধায় বিক্ষোভ সমাবেশ করতে পারছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৬ জন রাজনৈতিক বন্দিকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, এখনো প্রায় ৪০০ জন রাজনৈতিক বন্দি কারাগারে রয়েছেন।
এদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দা কাটেনি। স্থানীয় মুদ্রা বলিভার-এর ব্যাপক পতনের কারণে দেশটিতে বর্তমানে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার প্রায় ৫৭৫ শতাংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে।
মার্কিন ডলারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ লেনদেন বা ‘ডি ফ্যাক্টো ডলারাইজেশন’ চলার কারণে নির্দিষ্ট আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পর অনেকেই দেশে ডলারের প্রবাহ বাড়বে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু বলিভারে হিসাব করা বার্ষিক মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৫৭৫ শতাংশ।
মূল্যবৃদ্ধি ভেনেজুয়েলাবাসীকে ‘ধ্বংস করছে’ বলে মন্তব্য করেন অধিকারকর্মী জায়দা মুজিকা।
৬১ বছর বয়সী মুজিকা এএফপিকে বলেন, ‘নিকোলাস মাদুরোকে যখন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গেল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নিয়ে আমার অনেক আশা ছিল। তারা স্বৈরশাসককে সরিয়েছে, কিন্তু স্বৈরশাসনকে নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের জন্য উপকারী এমন কিছুই ঘটেনি।’
মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে কার্যত ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে সরকার পরিচালনা করছেন।
তিনি বিদেশি ও বেসরকারি পুঁজির জন্য বেশ কয়েকটি খাত উন্মুক্ত করেছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইইএসএ) অধ্যাপক হোসে ম্যানুয়েল পুয়েন্তে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।’
তিনি বলেন, যতদিন ভেনেজুয়েলায় ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি’ থাকবে, ততদিন দেশটির সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।
এমএইচআর