আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
হিমালয়ের পাদদেশে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মরদেহ থাকার আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে উজানে নতুন করে একটি জলাধারসদৃশ হ্রদ তৈরি হওয়ায় ফের বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গতকাল বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য এলাকায় হঠাৎ করে ভয়াবহ পানির ঢল নামে। প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেসে যায়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতাও কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালের বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গতদের সরিয়ে নিচ্ছে এবং জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে।
হিমবাহ ধস থেকেই ভয়াবহ ঢল
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। তবে স্যাটেলাইট চিত্র ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো ব্যাখ্যা হলো— নেপালের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় একটি বিশাল হিমবাহ ও পাথরের স্তর ধসে নদীর গতিপথ আটকে দেয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, কাদা ও পাথর প্রবল বেগে নিচের দিকে ধেয়ে যায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধসটি ল্যাংটাং লিরুং এলাকার কাছাকাছি থেকে নেমে এসে লহেন্দে খোলায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। এর ফলে নদীতে পানি জমে যায় এবং পরে বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, যে ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি প্রকৃতপক্ষে হিমবাহ ধসের সৃষ্ট কম্পনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ICIMOD-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বন্যার পানি মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর একটি অংশে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। এত দ্রুত পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক হয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ খুবই কম ছিল।
ফের বন্যার আশঙ্কা
ভয়াবহ প্রথম দফার বন্যার পরও বিপদ কাটেনি। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (NDRRMA) জানিয়েছে, সীমান্তের কাছে নদীর গতিপথে নতুন করে একটি হ্রদ বা জলাধার তৈরি হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সেখানে পানির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে এবং এটি ভেঙে গেলে আবারও ভাটির দিকে ভয়াবহ পানির ঢল নামতে পারে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন তৈরি হওয়া ওই বাধাহ্রদের পানির পরিমাণ বৃহস্পতিবার সকালে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার ছিল। আগামী কয়েক দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে জমা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ হ্রদটির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে এবং সম্ভাব্য বাঁধ ভাঙার পরিস্থিতি নিয়ে বন্যার মডেলিং করছে।
এই পরিস্থিতিতে নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ ভুটেকোশি নদীর ভাটির এলাকার বাসিন্দা, পর্যটক, উদ্ধারকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। নদীর তীর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের দুর্যোগকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ের ঢালে বরফ ও মাটির স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার কারণে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এই নির্দিষ্ট ঘটনাটির কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সম্ভব নয়। তবে উষ্ণতা বৃদ্ধি হিমবাহ গলন, বরফ-পাথরের অস্থিতিশীলতা এবং পাহাড়ি ঢালের ধসের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। নেপাল গত তিন দশকে তার পাহাড়ি বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গলনের হার আরও বেড়েছে।
রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু ঝুঁকি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লিজ স্টিফেন্সও সতর্ক করেছেন, হিমালয়ের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বন্যা শুধু অতিবৃষ্টির কারণে হয় না; ভূমিধস, তুষারধস, হিমবাহ ধস ও হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক পানি নির্গমন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের জটিল দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
উদ্ধারকাজে বড় চ্যালেঞ্জ
বন্যায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুর্গত অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই পথটি কৈলাস-মানস সরোবরগামী তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় হতাহত ও নিখোঁজের তালিকায় বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
উদ্ধারকারী দলগুলো নদী, ধ্বংসস্তূপ ও কাদায় আটকে থাকা মানুষদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা এবং পাহাড়ি এলাকায় নতুন ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় উদ্ধারকারীদেরও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
হিমালয়ের এই বিপর্যয় আবারও দেখিয়ে দিল, দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ, নদী ও পাহাড়ের পরিবর্তন একসঙ্গে বড় ধরনের দুর্যোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে প্রাণহানি কমাতে উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় আরও জোরদার করা জরুরি।
এফএ