আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
হিমালয়ের কোলে থাকা ছোট দেশ নেপাল। অথচ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে একাধিক বার সংবাদ শিরোনামে এ দেশটি।
ভোটেকোশী নদীতে আকস্মিক বন্যার কারণে এখনও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেপাল। কিন্তু ঠিক কোন কারণে বার বার প্রকৃতির রোষে পড়ে ভারতের প্রতিবেশী এই দেশ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই নেপালের ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে নজর রাখতে হবে। ভারতীয় এবং ইউরেশীয় পাতের সংযোগস্থলে অবস্থিত নেপাল ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণেই ভূমিকম্পপ্রবণ। এই দুই পাতের মধ্যে নিরন্তর সংঘর্ষ চলছে।
প্রতি বছর ভারতীয় পাত গড়ে ৫ সেন্টিমিটার করে ইউরেশীয় পাতের নীচে ঢুকে যাচ্ছে। নেপালেই রয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্ট।
হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম নবীন পর্বতশৃঙ্গ। তার ভূতাত্ত্বিক গঠন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। দুই পাতের সংঘর্ষের ফলে হিমালয়ে এখনও ভূ-উত্থান চলছে; অঞ্চলভেদে এই উত্থানের হার আলাদা।
দুই পাতের ঘর্ষণের জেরে প্রতি বছর এভারেস্টের উচ্চতা ৫ মিলিমিটার করে বাড়ছে। ওই দুই পাতের সংঘর্ষে ভূত্বকে বিপুল টেকটনিক চাপ সঞ্চিত হয়। কোনও ভূত্বকের শিলা স্তরের ফাটল বরাবর সেই চাপ হঠাৎ মুক্ত হলে ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পের ফলে সেই শক্তিই বাইরে বেরিয়ে আসছে।
হিমবাহধসের কারণে হিমালয় পর্বতের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বান নেমে আসা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এর আগেও এই বিষয়ে বিপদসঙ্কেত দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা।
তাতে বলা হয়েছিল, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে এই শতাব্দীর গোড়া থেকে শুরু করে প্রতি বছর দেড় ফুটেরও বেশি উচ্চতার বরফ গলে যাচ্ছে হিমালয়ের হিমবাহগুলিতে।
ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান, চীন-অধিকৃত তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৪০ বছর ধরে উপগ্রহের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি করা গবেষণাপত্রটি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল।
সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানিয়েছিলেন, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত যে গতিতে বরফ গলছিল হিমালয়ের হিমবাহগুলিতে, ২০০০ সালের পর হিমালয়ের হিমবাহ গলার গড় হার আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ওই গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জোশুয়া মরার বলেছিলেন, গত চার দশকে হিমবাহগুলির চার ভাগের এক ভাগই গলে গিয়েছে। হিমালয় জুড়ে উন্নয়নের নামে বনভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত নির্মাণ, সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ বন্ধ না হলে বর্ষার মরসুমে বন্যা ও ভূমিধসের মোকাবিলা করা কঠিন হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে ধৌলিগঙ্গা-সহ নদী অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বান, সে বছরের জুলাই মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের কিস্তওয়াড়ের বন্যা, ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমে সাউথ লোনাক হ্রদের বাঁধ ভেঙে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড হয়, ২০২৫ সালের অগস্টে উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী ও ধারালির বন্যার বানের পরে এবার ভোটেকাশীর ঘটনা হিমালয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার ইঙ্গিতবাহী বলেই মনে করছেন ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ।

২০২০ সালে জাতিসংঘের দেওয়া একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গিয়েছিল যে, কোশী-গণ্ডকী-কার্নালি নদী অববাহিকা বরাবর বহু হিমবাহের হ্রদ রয়েছে। এগুলির মধ্যে ৪৭টি থেকে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন ভূবিজ্ঞানীরা।
এই ৪৭টির মধ্যে ২৫টি রয়েছে চীনের তিব্বতে, ২১টি রয়েছে নেপালে আর একটি রয়েছে ভারতে। কিন্তু হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ নীচের নদী অববাহিকায় নেমে এসে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড তৈরি করতে পারে।
বরফ এবং পাথর ফাটিয়ে এই সব হ্রদের পানি নেমে আসতে পারে নদীর নিম্ন অববাহিকায়। নেপালে আকস্মিক বন্যা বিপর্যয়ের আবহে তিব্বতের মানস সরোবরের অদূরে আনসি হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় চীনের বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশের পরে এই ইয়ারলুং সাংপোর নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র। আবার ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশে প্রবেশের পরে নাম নিয়েছে যমুনা! বানের জেরে চীনের বাঁধে বিপর্যয় ঘটলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ভারত এবং বাংলাদেশে।
অন্য দিকে, আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্প নয়, তুষারধসের কারণেই ভয়াবহ এ আকস্মিক বান এসেছিল নেপালের ভোটেকোশী নদীতে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর এই বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত তারা।
বুধবার (২৬ আগস্ট) রাতে ওই সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক ভাবে যে ভূতাত্ত্বিক কম্পনকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হচ্ছিল, তা আদতে হিমবাহধস। হিমবাহ কাদামাটির তাল নিয়ে নদীর অববাহিকার দিকে নামতেই ওই বিপর্যয় ঘটে বলে দাবি করেছে ওই মার্কিন সংস্থা।
ভোটেকোশী নদীতে বানের কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে। নেপালের সংবাদমাধ্যম ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ বহু। বুধবার রাত পর্যন্ত ৪৬৮ জন পর্যটকের কোনও খোঁজ মেলেনি বলে জানিয়েছেন নেপালের পর্যটন দফতরের মুখপাত্র সুরজ ঘিমিরে।
চীনের সংবাদমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা এপি জানিয়েছে, বন্যার জেরে চীনের তিব্বতে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। খোঁজ নেই অন্তত ৫৫৮ জনের।
-এমএমএস